আশরাফ মাহদি
আশরাফ মাহদি

লালবাগ জামেয়ায় মুফতি আমিনী রহ. এর আগমন ১৯৬১ সালে। পিতা ওয়ায়েজউদ্দিন তাকে নিয়ে এসে লালবাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল শামসুল হক ফরিদপুরি রহ. এর হাতে সোপর্দ করে দিয়ে যান। ভীষণ ডানপিটে ও বাবার আদুরে ছেলে ফযলুল হকের মুফতি আমিনী হয়ে ওঠার গল্পটা এখান থেকেই শুরু।

১৯৬৮ সালের কথা। বরুনার প্রখ্যাত পীর শায়েখ লুতফুর রহমান রহ. লালবাগ আসলেন শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. (সদর সাহেব হুজুর) এর সাথে সাক্ষাত করতে। সদর সাহেবের সবচেয়ে নিকটবর্তী শাগরেদ ও খাদেম তখন মুফতি ফযলুল হক আমিনী। সে বছর লালবাগে তিনি মিশকাত পড়ছেন। শায়খে বরুনাকে বসিয়ে সদর সাহেব হুজুর শাগরেদ আমিনীকে কুতুব খানায় পাঠালেন। বললেন সায়্যিদ আহমদ শহিদ রহ. জীবনীর উপর একটা কিতাব নিয়ে আসতে।

সে সময় বড় বড় ওলামায়ে কেরাম থেকে শুরু করে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অনেকেই সদর সাহেব হুজুরের সাথে দেখা করতে আসত। খাস শাগরেদ হিসেবে সদর সাহেব মুফতি আমিনীকে নিজের সাথেই রাখতেন। দীর্ঘ আট বছর তিনি সদর সাহেবের এতটাই নিকটবর্তী ছিলেন যে অনেকে উনাকে হুজুরের পরিবারের সদস্যই মনে করত।

শুরুর দিকে মাদরাসা ছুটি হয়ে গেলে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি সহজে মিলত না। তবে দুই এক বছর পর থেকে আমিনী সাহেব ইচ্ছা করেই ছুটিতে সদর সাহেব হুজুরের খেদমতে থেকে যেতেন। হয়তো ততদিনে ইলমের সাগরের ডুবুরি হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন তিনি।

সদর সাহেব প্রথমবার তাকে বুখারী পড়িয়েছেন লালবাগ জামেয়ার মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ সাহেবের কাছে। এরপর বিন্নুরী টাউন পাঠিয়ে পড়িয়েছেন ইউসুফ বিন্নুরী রহ এর কাছে।

ছাত্র জমানার পুরো সময়টাতেই তাঁর কিতাব মুতালায়ার সার্বিক দিকনির্দেশনা সদর সাহেব হুজুর নিজে দিতেন। কখনো বিভিন্ন বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে করে প্রবন্ধ লিখে নিয়ে আসতে পাঠিয়ে দিতেন কুতুবখানায়। কখনো নিজ লিখনীর ক্ষেত্রে কোন তথ্য সূত্রের প্রয়োজন হলে প্রিয় ছাত্র আমিনীকে খুঁজে নিয়ে আসার নির্দেশ দিতেন। সে সময়ের কথা স্মরণ করে আমিনী সাহেব ও তাঁর সহপাঠী আব্দুল হাই সাহেব দা. বা. (লালবাগ জামেয়ার বর্তমান শায়খুল হাদিস) মাঝে মাঝে বলতেন, শুরুর দিকে কখনো তো এক হাওয়ালা খুঁজতে নাওয়া খাওয়া ভুলে কয়েকদিনও পড়ে থাকতে হয়েছে।

কিন্তু শুরুর এই দিনগুলো পার করে একটা সময় এসে সদর সাহেবের হাতেগড়া এই দুই ছাত্র ইতকানে ইলমের ক্ষেত্রে যে কতটা পরিণত হয়েছেন এটা এখন যারা আব্দুল হাই সাহেব হুজুরের বুখারীর দরস আর তাফসিরে বসে তারা কিছুটা অনুমান করতে পারে। আমিনী সাহেবের এই যোগ্যতার ব্যাপারে শুনেছি তাঁর স্নেহের ছাত্র, আমার শ্রদ্ধেয় উস্তাদ মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেবের কাছে। হুজুর বলতেন, কিতাব মুতালা করতে করতে আমিনী সাহেব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন যে, কোন মাজমুনের জন্য কোন কোন কিতাব দেখতে হবে, এবং কোন কিতাবের আলোচনার তরজ কি ধরণের এটা তিনি মুখস্থই বলে দিতেন। এবং নতুন আলেমের লেখা কোন কিতাব তাঁর হাতে পড়লে কিছুক্ষণ উলটে পালটে বলে দিতেন এখানে কি কি আলোচনা আছে এবং এর আগে এ বিষয়ের উপর ওলামায়ে কেরামের গুরুত্বপূর্ণ কি কি রচনা রয়েছে।

এই আমিনীকে হাফেজ্জি হুজুর রহ. ও এমনই দেখেছেন। তাই তো তিনি বলতেন, “আগার মুতালায়া কারনা হে তো আমিনী কি তারাহ কারো”।

মুফতি আমিনী রহ. এর মুতালায়ার মগ্নতার ব্যাপারে এই ঘটনাটা প্রসিদ্ধ। এশার নামাজের পর একবার হাফেজ্জী হুজুর রহ. দেখলেন, মুফতি আমিনী শাহী মসজিদের বারান্দায় পিলারের পাশে কিতাব নিয়ে বসেছে। হাফেজ্জি হুজুর তাহাজ্জুদের সময় ওযু করতে এসেও দেখেন, আমিনীর সেই বৈঠকের অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই। চোখ তখনো কিতাবের পাতায় গভীরভাবে নিবিষ্ট। হাফেজ্জি হুজুর কিছু বললেন না। ঘণ্টা খানেক পর যখন ফজরের প্রস্তুতি নিতে বের হলেন, তখন সামনে গিয়ে দেখেন আমিনীর সারা শরীরে মশারা মনের সুখে রক্ত খেয়ে যাচ্ছে। আমিনীর সেদিকে কোন খেয়ালই নেই। হাফেজ্জি হুজুরের ডাক দিয়ে বললেন, কি ফযলুল হক? নামাজ পড়বেনা? সম্মতি ফিরে পেয়ে আমিনী সাহেব বললেন, হুজুর, এশার নামাজ তো মাত্র পড়ে আসলাম। হুজুর ঘড়ি দেখিয়ে বললেন, ফজরের সময় হয়ে এসেছে। একটু পরই আযান দিবে।

মুফতি আমিনী রহ. তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ আদর্শ ছাত্রের ভূমিকায় লিখেছেন, “ছাত্রজীবনেই যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু নোট করে রাখার প্রবণতা আমার ছিল। আর কিতাব মুতালার নেশার প্রবলতার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. এর। তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ের উপর আমাকে দিয়ে কিতাব মুতালা করাতেন। দিক নির্দেশনা দিতেন। মাঝে মাঝে ধমকের সুরে বলতেন, “ফজলু, তুমি লেখো না কেন?”

সদর সাহেবের এই গুণটা আমিনী সাহেবের মধ্যে পুরাপুরি ছিল। ছাত্রদের নিয়ে বসা যে কোন মজলিশে যদি কাউকে খাতা কলম ছাড়া বসতে দেখতেন তাহলে এই ভুল দ্বিতীয়বার না করার খুব তাগিদ দিতেন। সাধারণত আমরা যারা সামনের সারিতে বসতাম খাতা কলম নিয়েই বসতাম। তাও কখনো খাতা আনতে ভুলে গেলে সামনের কাতারে বসার চিন্তা বাদ দিতাম। 😀

১৯৮৮ সাল। মুফতি আমিনী রহ. তখন লালবাগ জামেয়ার প্রিন্সিপাল। ছাত্রদের ইলম সাধনায় মনোযোগী হওয়া নিয়ে তাঁর চিন্তা ফিকির ঠিক ততটাই বেশি ছিল যতটা তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের করতে দেখে এসেছেন। ছাত্রদের তাফাক্কুহ ফিদ্দিন অর্থাৎ দ্বীনের সঠিক বুঝ অর্জনে সহায়ক হিসেবে তিনি আকাবির আসলাফদের জীবনী ও কর্মপন্থার পাঠ জরুরী মনে করতেন। আল্লামা ইবনুল জাওযির একটি উক্তি নকল করে তিনি এর সারকথাটা এইভাবে বলতেন,
“আদর্শ জীবন গড়ার জন্য শুধু ইলম অর্জন যথেষ্ট নয়, সাথে সাথে সালফে সালেহীনদের জীবনে এর আমল ও কর্মপন্থা সম্পর্কে সচেতন থাকাটাও জরুরী। কেবলমাত্র হালাল হারামের মাসআলা জেনে মন থেকে তাঁর উপর আমল করার ভক্তি তৈরী করাটা স্বভাবগত কারণেই অনেকসময় কঠিন হয়ে পড়ে। একজন মানুষ যদি শরিয়তকে ভক্তিসহকারে মানতে চায় তাহলে তার জন্য আকাবের আসলাফের রেখে যাওয়া নমুনার ব্যাপারে অবগতি প্রয়োজন। কেননা সামগ্রিক দিক বিবেচনায় কুরআন হাদিসের জ্ঞান অন্বেষণে তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অর্জন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী ছিল”।

এই লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই সে বছর থেকে প্রতি শুক্রবার বাদ আসর লালবাগ জামেয়ার ছাত্রদের নিয়ে
এই লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই সে বছর থেকে প্রতি শুক্রবার বাদ আসর লালবাগ জামেয়ার ছাত্রদের নিয়ে আকাবের ও সালফে সালেহীনদের জীবনী থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির আলোচনা ধারাবাহিকভাবে শুরু করেন তিনি। এবং সফলভাবে এই মজলিশ সাত বছর চলার পর “সলফ ও আকাবীর কা তরিকে মুতালা আওর উনকা ইলমী ইনহেমাক” নামে তাঁর মূল্যবান আলোচনার সংকলন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এর প্রথম অনুবাদ হয় ২০০৪ সালে “আদর্শ ছাত্র” নামে।

জীবদ্দশায় তিনি মজলিশে আকাবিরের এই জলসার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দিতেন। লালবাগ জামেয়ায় এখনো সেই সাপ্তাহিক জলসার সিলসিলা অব্যাহত আছে। একজন আদর্শ তালিবুল ইলম গড়ে তোলার লক্ষ্যে তার সমস্ত সফল পদক্ষেপ ও মহান ফিকিরকে আল্লাহ তায়ালা কবুল করুক। এবং ইলমে দ্বীনের ক্ষেত্রে তার সকল খেদমতকে কবুল করে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উঁচু মাকাম দান করুক।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here