সাঈদ সালমান

৩ই এপ্রিল ২০১১। নাজেরা শেষ করে হিফজ সবক নেওয়ার পর ছুটিতে সেদিন প্রথম বাড়ি আসা আমার। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের পাশেই গ্রামের ছোট্ট একটা মাদ্রাসায় পড়তাম আমি। বাড়ি পৌঁছে শুনতে পেলাম আগামীকাল দেশ-ব্যাপী হুজুরদের হরতাল; আমি যেনো কোথাও না বেরুই বাসা থেকে! তখনও ঠিক বুঝে ওঠতে পারিনি কিসের হরতাল? কে হরতাল ঘোষণা করলো? শুধু এইটুকু ভেবে রেখেছিলাম- যেহেতু আগামীকাল হুজুরদের মিছিল হবে এবং আমাকে কোথাও বেরুতেও নিষেধ করা হয়েছে বাসা থেকে, কাজেই আমি বেরুবই।

পরদিন সকাল ৭/৮ টার দিকে আব্বু বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। আমি নাস্তা করে একফাঁকে কাওকে কিছু না বলেই বেরিয়ে গেলাম বি-বাড়িয়ার বড় মাদ্রাসা “জামিয়া ইউনুছিয়ার” দিকে।

যেতে যেতে বেশ কয়েকবার অবাক হলাম! বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম বেশ কয়েকটা জায়গায়। আমি দেখছিলাম প্রতিটা পাড়ায় পাড়ায় কী করে এই হরতাল পালন করছে ছেলেরা! বড় মোড়গুলো ঘেরাও করে দাঁড়িয়ে ছিলো হিফজখানার ছাত্ররা; যাদের অধিকাংশ ১৪/১৫ বছর বয়সের। মোট কথা- আমার বয়সের ছেলেরা নিজ নিজ মহল্লায় দায়িত্বেরত ছিলো, পাগড়ি মাথায় ছোট ছোট লাঠি হাতে। মহল্লার ভেতরেও তারা একটা রিকশা চলতে দেয়নি!

এরপর যখন শহরের প্রাণকেন্দ্রগুলোর দিকে এগিয়ে গেলাম, তখন দেখছিলাম আরো বিস্ময়কর দৃশ্যগুলো! কুমাড়শীল মোড়, কোট রোড, ফকিরা পুল, টি.এ. রোড পর্যন্ত আমি হেঁটেছিলাম সেদিন। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে মাদ্রাসার বড় ছাত্র ভাইয়েরা বজ্রকন্ঠে স্লোগান দিচ্ছিলো এবং অনেকে মাথায় ও শরীরে কাফনের সাদা কাপড়ও জড়িয়ে ছিলো! অনেকে আবার লাঠি হাতে হরতাল পালন করছিলো। বড়দের স্লোগানের সাথে সাথে আমিও স্লোগান দিয়েছিলাম; না, শুধু আমি কেন, উপস্থিত বড় ছোট সকলকেই একজনের স্লোগানের সমর্থন দিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলো।

দুপুর নাগাদ আমি শহরের ঐসকল প্রাণকেন্দ্রগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। অতঃপর যোহরের আজানের পরপর বাসায় চলে আসলাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে পরিচিত অপরিচিত প্রায় অর্ধশত মানুষ জিজ্ঞেস করছিলো- হুজুর! কিসের মিছিল?
কিন্তু আমি তখন কিসের মিছিল সেটি বিস্তারিত জানার মতো বড় হইনি; সবে মাত্র হিফজ খানায় পড়া শুরু করেছি। তবে স্লোগান আর হরতালের বিভিন্ন কার্যকলাপ দেখে শুধু- হরতালটি কে ডেকেছিলো? এটার জবাব দেওয়ার মতো একটি নাম জানতে পেরেছিলাম, যে নামটি এর আগেও “জামিয়া ইউনুছিয়ার” মাহফিলে শুনতাম! যে মানুষটির বয়ান শুনতে মাহফিলের হাজারো শ্রোতাদের সাথে আমিও বসে থাকতাম। সে নামটি হলো- মুফতি আমিনী (রহ.)। সম্পূর্ণ নাম – মুফতি ফজলুল হক আমিনী।

সেদিন বিকেল নাগাদ টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে সারাদেশের এই নজিরবিহীন, বিরল সকাল-সন্ধ্যা হরতালের খবর দেখানো হলো। এবং একটি নাম উল্লেখ করা হলো হরতালটির ঘোষক হিসেবে- মুফতি আমিনী। কোরআন বিরোধী নারীনীতি প্রণয়ন করায় সরকার বিরোধী ঐ নজীরবিহীন হরতাল পালিত হয়েছিলো।

পরদিন সারাদেশে প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে সেই নামটি ছিলো প্রধান আলোচ্য বিষয়; কিন্তু আমার মুখে ছিলো না! কারণ সেইদিন থেকে নিজের অজান্তেই ঐ নামটি গেঁথে গেলো আমার অন্তরে। সেদিনের পর থেকে আমি আরেকটি বার এই মহামনিষীকে চোখের তারায় দেখতে চেয়েছিলাম। অনেক আগ্রহ কাজ করত ওই নামটার ওপর!

কিন্তু হায়!! দুর্ভাগ্য আমার, আমি সেই মানুষটিকে আর দেখতে পাইনি । পরের বছরই ১২ই ডিসেম্বর রাতে হঠাৎ আমাদের হিফজ খানার ২ জন ওস্তাদজী সবাইকে ডেকে তুললো এবং কান্না করতে করতে জানালো একজন বড় হুজুর ইন্তেকাল করেছেন। নাম মুফতি….. আ মি নী…। আমি বসেছিলাম গভীর রাতের কাঁচা ঘুম চোখে নিয়ে সবার সাথে। আচমকা এক লাফে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম কীভাবে তখন জানি না। সেই গভীর রাতে অধিকাংশ ছাত্র ভাইরা যখন ঘুম ঘুম চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিলো আমার দিকে, আমি তখন এক পাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে কেঁদে যাচ্ছি বুক ভাসিয়ে । আমাদের ওস্তাদজীরাও কাঁদছিলো। পরে আমাদের ওস্তাদজীরা সবাইকে কোরআন খতম দেওয়ার আদেশ দিয়ে ফজরের সাথে সাথে চলে গেলেন জানাজা নামাজ পড়তে ঢাকা । আমি সহ আরো কয়েকজন যেতো চেয়েছিলাম, কিন্তু মাইক্রোতে জায়গার সংকুলান হবে না জানিয়ে আমাদের নেওয়া হয়নি ।

সেদিন সারা বেলা আমি বারবার অশ্রুসজল হয়েছিলাম। আমার বোধশক্তি হবার পর সেটিই ছিলো আমার জীবনের প্রথম খুব আঘাত পাওয়া মৃত্যু সংবাদ ।
যে সংবাদ শুনে আমার চোখের জলেরা বাঁধ ভেঙে ছুটে ছিলো আমার অবাধ্য হয়ে। যে সংবাদ শুনে আমার একটি স্বপ্নও মৃত্যু বরণ করেছিলো সেদিন! আমি সেদিনের পর আর স্বপ্ন দেখতে পারিনি “মুফতি আমিনী” রহ. কে আর একটি বার স্বচক্ষে দেখার। আর একটি আন্দোলনের ডাকে ছুটে যাওয়া! সেইদিনটি ছিলো ১২/১২/১২ তারিখ।
আজ শুধু সেই স্মৃতিগুলো বুকে ধারণ করে, স্মৃতিপটে তাকে নীরবে আঁকি।

২০১২ সালের ১২ই ডিসেম্বর আল্লাহর এই মাকবূল বান্দা তাঁর ডাকে জবাব দিয়ে ইহজগৎ ত্যাগ করে, আমার মতো অগণিত আশেকান রেখে চলে গেছেন রব্বে কা’বার সান্নিধ্য পেতে।

জীবনে অসংখ্য গোনার করেছি, সে গোনার ফাঁকে যদি কোনদিন কোন একটা হলেও নেকী করে থাকি, ভালো কাজ করে থাকি, আল্লাহ তোমাকে এই গোনাহগারের সেই নেকীটির উসীলায় পূর্বের ন্যায় আজও মিনতি করছি- ঐ মহামনিষীকে তুমি তোমার জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানটি দান করে দিয়ো!

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here