চলমান ঘটনাপ্রবাহের গল্প শুরু করি একটু পেছন থেকে। সপ্তাহ তিনেক আগের কথা। সম্ভবত ৩০শে অক্টোবর জুমার দিন। ধোলাইপাড়ের ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বাদ জুমা আমার মসজিদেই আমার সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তারা সবাই স্থানীয় বিভিন্ন মসজিদের ইমাম সাহেবান । আগে থেকেই যোগাযোগ করে সময় নিয়েছিলেন তারা। পরিস্থিতির আপডেট জানিয়ে পরবর্তি করণীয় বিষয়ে পরামর্শ করাই ছিল সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ।
আলাপচারিতায় তারা জানালেন, পদ্মাসেতু মহাসড়কের গোড়ায় যেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে, সেখানে লাগোয়া দুদিকে রয়েছে দুটি মসজিদ। বিষয়টি তদন্তকারী সরকারী কর্মকর্তাদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। তাই সরকারের দায়িত্বশীল মহল চাইছে না এখানে ভাস্কর্য নির্মাণ করে তৌহিদী জনতার রোষাণলে পড়তে। তবে একটি মহল তো আছেই যারা সব কিছু গায়ের জোরে বাস্তবায়ন করতে চায়।
তবে বিষয়টি যেহেতু সরকারের একটি মেগা প্রজেক্ট, তাই খুব সহজেই এর সমাধান হয়ে যাবে, এমনটি তারাও আশা করতে পারছেন না। এত বড় একটি আন্দোলন, অথচ এর নেতৃত্ব স্থানীয় পর্যায়ের ইমাম-আলেমগণ দিচ্ছেন। আর তাই তারা পড়েছেন প্রচন্ড চাপের মুখে। প্রশাসন ও সরকারী এজেন্সিগুলোর উপর্যপুরি জিজ্ঞাসাবাদে তাদের অবস্থা নাকাল। এই পরিস্থিতিতে কী করণীয় তা নিয়ে তারা শীর্ষ ওলামা-মাশায়েখের সাথে সলাপরামর্শ করছেন। সেই সুবাদে এসেছেন আমার সাথেও কথা বলতে।
আমি তাদের কাছে জানতে চাইলাম, কার কার কাছে গিয়েছেন এবং তারা কী বলেছেন? তারা শোনালেন তাদের কারগুজারী। বিশেষভাবে বললেন দুজনের কথা। একজন মুহিউসসুন্নাহ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান। আর অপরজন হলেন আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মসউদ।
ফরিদ মসউদ সাহেবের যে কথাগুলো তারা উদ্ধৃত করলেন, তা আমার কাছে ভালো লেগেছে । তিনি নিজে কী করতে পারবেন এ বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, “সরকারের উঁচু পর্যায়ে সম্ভব হলে আমি কথাগুলো পৌছাবো । এজন্য তিনি মাহমুদুল হাসান সাহেবের কথা বলেছেন যে তিনি যেহেতু কওমীর নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছ্ন, তাই তিনি পারেন একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে। সেখানে আমিও থাকব এবং প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করব।
ফরিদ মসউদ সাহেব দ্বিতীয় যে কথাটি বলেছেন, সেটি হল-শুধু আলোচনা করে সমাধান হবে না। আলোচনা ফলপ্রসু হতে হলে আগে মাঠ তৈরি করতে হবে। মাঠ গরম না হলে টেবিলের আলোচনায় কাজ হবে না। আর মাঠে জনমত তৈরি করতে হলে দুজন ব্যক্তির ভূমিকার কথা তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ফয়জুল করিম সাহেব এবং মামুনুল হক।
ফরিদ মসউদ সাহেবের কথা তাদের কাছে যুক্তিপূর্ণ মনে হয়েছে বিধায় তারা আমার সাথে কথা বলতে এসেছেন। আমি তাদের দীর্ঘ কারগুজারী শুনলাম। তাদের মনোভাব বুঝলাম। আর তাদের প্রতি আমার সমর্থন ও যে কোনো সহযেগিতার প্রতুশ্রুতি দিলাম। সেমতে প্রাথমিক কথা এমনই সাব্যস্থ হলো যে, আমি এবং ফয়জুল করিম ভাই আমাদের দুজনকে রেখে একটা বড় রকমের মাঠ প্রোগ্রাম করা হবে। এমন একটা খসড়া পরিকল্পনার আলোচনা করে তারা আমার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এরপর ১৩ নভেম্বর বাদজুমা ধুপখোলা মাঠে বড় রকমের সমাবেশ হল।
দুই.
ভাস্কর্যবিরোধী আমাদের কড়া বক্তব্যে একটি মহল বেশ ব্যজার। কিন্তু তারা একটি বিচ্ছিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের বেশি কিছু মনে হচ্ছে না। তারা একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টাও করছে। সেটি হল, ভাস্কর্য তথা মূর্তির বিরোধিতাকে বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা হিসাবে চিত্রিত করা। এরা চাচ্ছে সরকারকে ইসলামের মুখোমুখী দাড় করিয়ে দিতে ।এরা এই সংঘাতকে সারা দেশেও ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছে।
তিন.
হেফাজতে ইসলামের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়েও একটি মহল নাখোশ। তাই তারা চটেছে আমীরে হেফাজত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে। ভাস্কর্যের বিরোধিতা আর হেফাজতের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে অসন্তুষ্টি উভয়বিধ কারণের প্রভাব পড়ছে আমাদের বিভিন্ন মাহফিলে। অতিউৎসাহী একটি মহল বাগড়া বাধাচ্ছে এতে। সর্বশেষ গতকাল রাতে নড়াইলের লোহাগাড়ার শামুখখোলা মাদরাসায় ছিল মাহফিল। কালনা ঘাটে ফেরি আটকে দিয়ে আমাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। মাহফিলটিকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় ব্যপক সাড়া পড়েছিল। জনসমাগমও হয়েছিল প্রচুর। কিন্তু আমি যেতে না পারায় মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ। এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সরকারদলের মধ্যেও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আমি যখন আজ সকালে ঢাকা ফিরছিলাম, আমাকে ফোন করে কথা বললেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজা। তিনি অনাকাঙ্খীত এই ঘটনার জন্য দু:খ প্রকাশ করলেন। স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষ যেন এই ঘটনার জন্য তাকে দায়ী মনে না করে, সে আহ্বান জানালেন। সেই সাথে সময়সুযোগ করে আপ্যায়নের দাওয়াতও দিলেন।
চার.
আমি একটি কথা খুব পরিস্কার ভাষায় তুলে ধরছি যে, হাদীসের আলোকে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধুর মূর্তি/ভস্কর্য তৈরির কারণে তাঁর কবরে আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব হতে পারে। লক্ষ করছি, যারা প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে, তাদের মনে কথাটি দাগ কাটছে। তাদের মন ব্যথাতুর হচ্ছে। তারা সত্য বুঝতে পারছে। এটা মূর্তিপ্রেমীদের কাছে মোটেই ভালো লাগার কথা না।
পাঁচ.
আমরা কখনই হটকারিতার পথে পা বাড়াবো না ইনশাআল্লাহ!! তবে সরকার যদি ভাস্কর্য নামে মূর্তি-সংস্কৃতি এভাবেই ছড়িয়ে দিতে থাকে, ক্ষমতার জোরে যদি আমাদের ইসলামী ঐতিহ্যকে এভাবেই ধ্বংস করতে থাকে, তাহলে বহু কাঠখড়ি পুড়িয়ে ইসলামী মহলের সাথে যতটুকু দূরত্ব কমিয়েছে, ভাস্কর্য ইস্যুতে সরকারের মনোভাব অনড় থাকলে সেই দূরত্ব বাড়বে আবার যোজন যোজন!

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here