• ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা
  • বিএনপি নির্বাচনে আসছে ধরে নিয়েই পরিকল্পনা
  • জোট সম্প্রসারণ ও নির্বাচনী মিত্র বাড়ানোর পরিকল্পনায় আ.লীগ
  • আসন বণ্টনের প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে
  • নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু
  • মন্ত্রিসভার আকার ২৫-৩০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে

একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমান জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) এবং ১৪-দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতার কার্যক্রম শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। শরিকদের কাকে কত আসন দেওয়া হতে পারে, সে ব্যাপারে একটা প্রাথমিক রূপরেখাও তৈরি করা হয়েছে। তাতে জাপাসহ শরিকদের জন্য ৭০টির মতো আসন রাখা হয়েছে বলে সরকারি দলের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রটি আরও জানায়, এরই মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতিমূলক কাজও শুরু করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারি এই মন্ত্রিসভার আকার ২৫ থেকে ৩০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। সংসদে প্রতিনিধিত্ব নেই—এমন কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান পাচ্ছেন না, এখন পর্যন্ত এটা চূড়ান্ত। তবে এই মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার আগে জোটসঙ্গী এবং সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে—এমন দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী।

আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এর মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা, ড. কামাল হোসেনের গণফোরামসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় বিএনপিও শামিল হতে চায়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটও বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়ে একমত হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি দল আওয়ামী লীগও জোট সম্প্রসারণ ও নির্বাচনী মিত্র বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।

জানা গেছে, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে—এমনটা ধরে নিয়েই এই পরিকল্পনা ও আসন বণ্টনের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে এলে ২০০৮ সালের নির্বাচনের মতোই এরশাদের দল জাপা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে। এরই মধ্যে এরশাদ তাঁর দলের জন্য ৮০ আসন চান বলে জাপা সূত্রে জানা গেছে। বর্তমান সংসদে ৩৪টি আসন নিয়ে জাপা বিরোধী দলের আসনে বসেছে। আর আওয়ামী লীগ এককভাবে পায় ২৩৪ আসন।

আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ৭০টি আসন শরিকদের জন্য রাখার কথা ভাবছে। এর মধ্যে এরশাদের জাপাকে ৪০ টির মধ্যে রাখতে চায়। ১৪-দলীয় জোটের শরিকদের বর্তমানে সাংসদ আছেন ১৫ জন। আগামী নির্বাচনেও এরই মধ্যে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। জোটে নতুন দল অন্তর্ভুক্ত বা মিত্র যোগ হলে, তাদের জন্য ১৫টি আসন রেখে বাকি ২৩০ আসনে আওয়ামী লীগ নিজেদের প্রার্থী বাছাইয়ের কার্যক্রম চালাচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টিসহ শরিক দলগুলোকে ৬৫ থেকে ৭০টি আসন দেওয়া হবে। আর বিএনপি নির্বাচনে না এলে জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে নির্বাচন করবে, এটা তারাই (জাপা) বলেছে।

নিজ দলের প্রার্থী বাছাই
গত রোববার নারায়ণগঞ্জের এক অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, আওয়ামী লীগ প্রাথমিকভাবে ১০০ আসনের প্রার্থী তালিকা করেছে। এই বিষয়ে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদেরকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের তালিকা যদি হয়েও থাকে, সেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া কেউ জানেন না। তবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ৬০ থেকে ৭০ জনকে আভাস-ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আগামী মাসে দলীয় তালিকা চূড়ান্ত হবে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, অনেক প্রার্থীর মধ্যে যাঁরা এগিয়ে আছেন এমন অনেককে ঘাটতি পূরণ করতে কিছু কিছু ‘টিপস’ দেওয়া হয়েছে। তার মানে তাঁকে এমন ধারণা দেওয়া হচ্ছে, আরও ভালোভাবে কাজ করলে, কিছু ঘাটতি পূরণ করলে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি নির্বাচনেই গড়ে ৫০ জন মন্ত্রী-সাংসদ বাদ পড়েন। আর চোখ বন্ধ করেই ১০০ জন নেতাকে বেছে নেওয়া যায় যে তাঁরা মনোনয়ন পাচ্ছেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে আগাম কারও নাম বলা হবে না।

নির্বাচনকালীন সরকার
নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তুতি শুরু করেছেন। এ জন্য জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরই মধ্যে সংসদে বিরোধী দল জাপার চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সঙ্গে গত রোববার রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে নিজ কার্যালয়ে অনির্ধারিত বৈঠক করেন। জাপা সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকে এরশাদ নতুন করে তাঁর দলের তিনজনকে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় রাখার অনুরোধ করেন। তাঁরা হলেন দলের মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু ও কাজী ফিরোজ রশীদ।

জাপার মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় আমাদের ছয়জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও একজন উপদেষ্টা ছিলেন। এবার আমাদের সংসদ সদস্যও বেশি। তাই মন্ত্রিসভায় একটু বেশি আশা করতেই পারি।’

গতকাল ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, জাতীয় পার্টি তাদের আরও দু-একজনকে নির্বাচনকালীন সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে অনুরোধ জানিয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করবেন, এটি তাঁর এখতিয়ার।

সরকার দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচনকালীন সরকার, আসন সমঝোতাসহ নানা বিষয়ে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাপার কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদের সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদের দুই অংশ, তরীকত ফেডারেশন ও জাতীয় পার্টির (জেপি) সংসদে প্রতিনিধিত্ব আছে। বাকি শরিকদের কোনো সাংসদ নেই। ফলে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এবং নেই-এমন সব শরিকদের সঙ্গে চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আলোচনা করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের একাংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনু নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় থাকছেন বলে জানা গেছে।

সমজাকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন গতকাল বলেন, এরশাদের সঙ্গে নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। প্রধানমন্ত্রী গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেছেন যে নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন নিয়ে ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গেও আলোচনা করবেন।

গতকাল ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, আগামী মাসের মাঝামাঝি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হতে পারে। নির্বাচনকালীন সরকারের আকার গতবারের কাছাকাছি হবে। এতে ‘টেকনোক্র্যাট’ (সাংসদ নন এমন ব্যক্তি) মন্ত্রী থাকবেন না।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে যে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা হয়েছিল, তাতে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে ছিল ২৯ সদস্যের। এর বাইরে ছিলেন ১০ জন উপদেষ্টা।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, এবারের মন্ত্রিসভার আকার ২৫ থেকে ৩০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। সংসদে প্রতিনিধিত্ব নেই, এমন কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান পাচ্ছেন না-এখন পর্যন্ত এটা চূড়ান্ত। এবারও উপদেষ্টা রাখা হবে, সে সংখ্যা এখনো নিশ্চিত করে জানা যায়নি।

যদিও নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে সংবিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। আর সংবিধানে মন্ত্রিসভা গঠনের একক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। এ জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা, এর আকার ও কাকে নেওয়া হবে আর কাকে বর্তমান মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হবে-তা একান্তই প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করছে।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here