শফিকুল ইসলাম সোহাগ:


সংসদে যাওয়ার দৌড়ে থেমে নেই ইসলামী দলগুলোও।
নিবন্ধিত কী অনিবন্ধিত— ভোটের আগে সবাই বিভিন্ন জোটে ছুটছে। গড়ছে নিত্যনতুন জোট।
দলগুলোর নেতারাই জানালেন, উদ্দেশ্য আগামী সংসদে প্রবেশের রাস্তা তৈরি করা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তরিকত ফেডারেশন ছাড়া নিবন্ধিত সবগুলো ইসলামী দল ভোট বর্জন করলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যেতে চায় সংসদে। অধিকাংশ দলেরই এককভাবে ভোট করে সংসদে যাওয়ার সক্ষমতা না থাকায় ইসলামী দলগুলোর চলছে কৌশলী প্রস্তুতি। ভোটের মাঠে অবস্থান দুর্বল হলেও বড় দলের কাছে আসনের চাহিদার তালিকা দীর্ঘ।

একমাত্র ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বলয়ের বাইরে থাকা দলগুলোও জোটে ভেড়ার চেষ্টা করছে। সবারই লক্ষ্য সংসদে আসন পাওয়া। নিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক দলের সংখ্যা ৯টি। এর বাইরে অনিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক দল রয়েছে অর্ধশত। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে হাই কোর্টের রায়ে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান শরিক জামায়াত রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেও তা নিষ্পত্তি হয়নি। সর্বোচ্চ আদালতের রায় পক্ষে না গেলে আগামী নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতকে ৩৩ আসন ছেড়েছিল বিএনপি। তবে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন ৩৯ আসনে। জয়ী হন দুই প্রার্থী। যুদ্ধাপরাধের বিচারে এখন কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে দলটি। শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এবার জোটপ্রধান বিএনপির কাছে আগের চেয়েও বেশি আসন চায়। দলের নেতারা জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ছাড়াই তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে হবে এমন প্রস্তুতি নিয়েই তারা এগোচ্ছেন। যে কোনো মূল্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে তারা।

জামায়াতের পর অবস্থান মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম চরমোনাইর পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের। ২০০৮ সালে মোট ভোটের শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ পায় দলটি। সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনে সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে আলোচনায় রয়েছে দলটি। ইতিমধ্যে এককভাবে নির্বাচনের জন্য ৩০০ আসনের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। দলের আমির চরমোনাইর পীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম বলেন, কয়েকটি দল তাদের সঙ্গে জোট গড়তে প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তারা নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে কোনো জোটে যাবেন না। নিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক দলের মধ্যে আরও রয়েছে ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট। ২০০৮ সালে জমিয়ত দুই আসনে ও ইসলামী ঐক্যজোট একটি আসনে জামানত রক্ষা করতে পেরেছিল। দল দুটি সম্প্রতি ভেঙেছে। বাকিরা ২০০৮ সালের ভোটে সব আসনে জামানত হারিয়েছিল। সুফি ঘরানার জাকের পার্টি ও তরিকত ফেডারেশনও নিবন্ধিত দল। জামায়াত, জমিয়ত ও খেলাফত মজলিস রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলে। ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ রয়েছে এ জোটে। জাতীয় পাটির নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও জাতীয় পার্টির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করেছে। জাতীয় ইসলামী মহাজোট নামে ৩৫টি অনিবন্ধিত দলও রয়েছে এ জোটে। আওয়ামী লীগের জোটে কওমি মাদ্রাসা ঘরানার কোনো ইসলামী দল নেই। সুফি ঘরানার তরিকত ফেডারেশন রয়েছে। তবে তরিকত ফেডারেশনের মহাসমচিব এম এ আউয়াল ১৫টি অনিবন্ধিত দলের সমন্বয়ে গঠিত ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (আইডিএ) নামে সংগঠনের কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে এ সংগঠনের আত্মপ্রকাশ বলে জানিয়েছেন এম এ আউয়াল। আওয়ামী লীগের কাছে তরিকতের এবার দাবি ১৫ আসন। মহাজোটে যাওয়ার চেষ্টা করছে প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ঐক্যজোট। দলটি বছর দুয়েক হয় বিএনপির জোট ছেড়েছে। হেফাজতে ইসলামের সংশ্লিষ্ট এ দলটি আগামী নির্বাচনে ২০টি আসনে আওয়ামী লীগের ‘সহায়তা’ চায়। কয়েক মাস আগে তারা ‘সহায়তা’ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠিও দেয়। দলটির মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, আগামীতে তারা একক শক্তিতেই লড়বেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট গড়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে দুটি আসনে জয়ী জমিয়তকেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দুটি আসন ছেড়েছিল বিএনপি। দলটি সম্প্রতি ভেঙেছে। একটি অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন নূর হোসাইন কাসেমী, অন্য অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস। দুই অংশই পাঁচটি করে আসন চাইছে। মুফতি ওয়াক্কাস বলেন, বিএনপি জোট নির্বাচনে অংশ নিলে তারাও ভোট করবেন। খেলাফত মজলিসকে ২০০৮ সালে একটি আসনও ছাড়েনি বিএনপি। এবার সিলেট ২ ও ৩, পাবনা-১ সহ কয়েকটি আসনে এরই মধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। হবিগঞ্জ-৪ আসনে প্রার্থী দলের মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের। তিনি জানান, তাদের প্রার্থীর তালিকা বিএনপিকে দেওয়া হবে শিগগির। তারপর আলোচনায় ঠিক হবে কোন কোন আসনে তারা নির্বাচন করবেন। ৩০ আসনে নির্বাচন করার মতো শক্তি-সামর্থ্য তাদের রয়েছে। জাতীয় পার্টির জোটে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দাবি ১৩ আসন। দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা আশা করি এইচ এম এরশাদ আমাদের সঠিক মূল্যায়ন করবেন। এ জোটের শরিক বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট চায় ১০ আসন। জাতীয় পার্টির জোটে থাকা ৩৫ দলের জোট ‘জাতীয় ইসলামী মহাজোটের’ দাবি ৩০ আসন। জাকের পার্টিও যেতে চায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে। ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশও মহাজোটে ভিড়তে চায়।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here