মুহাম্মদ এহসানুল হক : শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক  অতি জনপ্রিয় একটি নাম। হাজার জনতার কণ্ঠে যুগ যুগ  উচ্চারিত নাম। ধ্বনিত হয়েছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। হয়েছে অনুরণিত । স্থান করে নিয়েছে মানুষের হৃদয় মণিকোঠায়। শাইখুল হাদীস আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসের গলায় হীরকখণ্ড খচিত এক অলঙ্কার স্বরূপ। এই স্বীকৃতি আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে হাফেজ্জী হুজুর রহ. দিয়ে গেছেন।

আশির দশকে হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর নেতৃত্বে তাওবার আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনকার কথা। খেলাফত আন্দোলনের মিটিংগুলোতে সিনিয়র নায়েবে আমির হিসেবে শায়খুল হাদীস বসতেন। কিন্তু মিটিং লম্বা হতে থাকলে অথবা অপ্রয়োজনীয় মনে হলে পড়ার টেবিলে ফিরে যেতেন। যখন সিদ্ধান্তের সময় আসত হাফেজ্জী হুজুর রহ. বলতেন আজিজুল হক কোথায় তাকে ডেকে আনো। ডেকে আনার পর একটু বসতেন, আবার চলে যেতেন পড়ার টেবিলে। একদিন অন্যেরা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, হুজুর যাকে বারবার ধরে আনতে হয় তাকে দিয়ে ইসলামি আন্দোলনের কী হবে? জবাবে হাফেজ্জী হুজুর রহ. বলেন, আচ্ছা কোনো বিয়ে কি অলঙ্কার ছাড়া হয়? হয় না। কিন্তু অলঙ্কার তো কোনো কাজ করে না। শোকেজে সাজিয়ে রাখতে হয়। কাজ সব বউই করে। আজিজুল হক তোমাদের অলংকার স্বরূপ। সব কাজ তো তোমরাই করবে। কিন্তু তাকে ছাড়া তোমরা এ সমাজে বিকাবে না।

সত্যিই, স্বাধীন বাংলাদেশের বিয়াল্লিশ বছরের এ পযর্ন্ত ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাস এ কথাই বলে। এ পযর্š— ঢাকার রাজপথ গরম করা সব কটি আন্দোলন সংগ্রাম শাইখুল হাদীস নামের সংগ্রামের অগ্নিগিরি থেকেই উৎসারিত হয়েছে। শাইখুল হাদীসকে ছাড়া কিছুই হয়নি। বর্তমান সময়ের শাইখুল হাদীস বিহীন মৃতপ্রায় ইসলামি আন্দোলন একথা ইতোমধ্যেই প্রামাণ করে দিয়েছে এ দেশের ইসলামি আন্দোলনে শাইখুল হাদীস নামটা কতা প্রয়োজনীয় কতোটা ক্ষমতাধর ছিল।

এদেশের ইসলামি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হাফেজ্জী হুজুর রহ. যেই রাজনীতির সূচনা করেছিলেন প্রায় তিন যুগ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যিনি আলেমদের সংসদ পযর্ন্ত পৌঁছিয়েছেন তিনি শাইখুল হাদীস ছাড়া আর কেউ নন। বর্তমান বাংলাদেশে যতোগুলো ইসলামি দল কাজ করছে প্রায় সবগুলোর নেতৃত্বে কোনো এক সময় তিনি ছিলেন, হয়তো প্রতিষ্ঠাতা অথবা চেয়ারম্যান অথবা সিনিয়র নায়েবে আমির হিসেবে। সত্তুরের দশকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ইসলামি দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি ছিলেন শাইখুল হাদীস, সেক্রেটারি ছিলেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। আশির শুরুতে হাফেজ্জী হুজুরের খেলাফত আন্দোলনে তিনি ছিলেন দক্ষিনহস্ত সিনিয়র নায়েবে আমির। প্রাচীন সংগঠন নেজামে ইসলাম পার্টিরও নেতৃত্বও তিনি দিয়েছেন। ইসলামি শাসনতন্ত্র আন্দোলনেরও তিনি অন্যতম  প্রতিষ্ঠাতা। আমৃত্যু নেতৃত্ব দেয়া প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তো তার হাতেই লালিত পালিত হয়েছে। শুধু তাই নয় একানব্বইয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারি ইসলামী ঐক্যজোট তাকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল।

শাইখুল হাদীসের রাজনৈতিক জীবন এতোটাই সফল ও বণার্ঢ্য যে, অনেকে তাকে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে চিনে থাকেন। অনেকের কাছে মিডিয়ার লাইম লাইটে থাকা এ পরিচয় ঢেকে দেয় তার আসল স্বকীয়তা, মনে হয় তিনি একজন সফল নেতা সফল রাজনীতিবিদ। অথচ সমান তালে তিনি একজন বিখ্যাত হাদিস বিশারদ, জ্ঞানতাপস, বিশিষ্ট অনুবাদক, বিদগ্ধ আরবি ও বাংলা সাহিত্যিক, প্রখ্যাত বক্তা, তাসাউফের মারহালায় উচ্চমার্গের একজন সাধক। কিন্তু সব পরিচয় ছাপিয়ে যে পরিচয়টি তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে তা হলো তিনি একজন সংগ্রামী নেতা, আপোসহীন সিপাহসালার। বাতিলের হৃদপিণ্ডে কম্পনসৃষ্টিকারী মূর্তিমান এক আতংকের নাম শাইখুল হাদীস। শাইখুল হাদীসের এই বণার্ঢ্য রাজনৈতিক জীবনের কিছু ঘটনা আর না বলে পারছি না।

শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর সংগ্রামী জীবনের ওপর ফোকাস করলে জ্বলজ্বল করে উঠবে যে কয়টি অধ্যায় বা উপাখ্যান তার মধ্যে বাবরী মসজিদ আন্দোলন অন্যতম একটি। গোটা পৃথিবীর তাবৎ মুসলমানের পক্ষে এত ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্রের একজন নেতা হিসেবে ভারতের মত পরাক্রমশালী একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে বিপ্লবী ভূমিকা তিনি গ্রহণ করেছিলেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। বাবরী মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদ তো সারা পৃথিবীতেই হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভে নেমে এসেছে রাজপথে।
৮ ডিসেম্বর সরকারিভাবে জাতীয় শোক দিবস পালিত হয়েছে পাকিস্তানে। আরব আমিরাতেও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানও এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। এমন কি অমুসলিম দেশ ইংল্যান্ডও প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমেরিকায় এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে মিটিং মিছিল হয়েছে।  সৌদি আরব তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। ওআইসিভুক্ত দেশগুলো মুসলমানদের ধর্মীয় স্থান ধ্বংস এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তায় ব্যাঘাত ঘটানোর দায়ে ভারত সরকারকে হুঁশিয়ার করে দেয়।

প্রতিবাদ তো ঠিকই হয়েছে। কিন্তু চার লাখ জনতার বহর নিয়ে অযোধ্যা অভিমুখে লংমার্চ করার হিম্মত শাইখুল হাদীস ছাড়া আর কারও হয়নি।

বাবরী মসজিদ ধ্বংসের পরদিন থেকেই তিনি ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরদিন বায়তুল মোকাররামের দক্ষিণ গেটে শাইখুল হাদীসের সভাপত্বিতে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গোটা জাতিকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদে অবতীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণের ডাক দেন। আলেম সমাজের পক্ষ থেকে এই ন্যাক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে ৮ই ডিসেম্বর দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করা হয়।
বাবরী মসজিদ আন্দোলনের সময় এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল বর্তমান প্রজন্মের কাছে যা অকল্পনীয়। এমনি কয়েকটি ঘটনাÑ

দুই.
বাবরী মসজিদ ধ্বংসের পরের দিন ঢাকার মাটিতে ভারতের ক্রিকেট দলের খেলা ছিল। মাত্র একদিন আগে যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমানদের হৃদয়ের সিংহাসন বাবরী মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে, পরের দিন তাদের জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলা দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশের জাতীয় স্টেডিয়ামে ব্যাপারটা ছিল আমাদের জন্য লজ্জাজনক, অপমানজনক। যথাসময়ে ঢাকার মাঠে ভারতীয় দল নির্বিঘেœ খেলাও শুরুও করে দেয়। সরকারের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা না থাকলেও আলেমদের পক্ষে তা সহ্য করা কঠিন ছিল। শায়খুল হাদীসের সমাবেশ যখন বায়তুল মোকাররামের সামনে চলছে, ঠিক তখনই পাশের জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাংলাদেশের সাথে খেলা চলছে।
সমাবেশে বক্তব্যের একপর্যায়ে শাইখুল হাদীস বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এই গতকাল যারা মুসলমানদের হৃদয়মিনার আল্লাহর ঘর মসজিদ ভেঙেছে, আজ তারা আমাদের দেশে অতিথি হয়ে এই স্টেডিয়ামে খেলবে, আমরা চুপ করে বসে থাকবো, এটা কোনো দিন হতে পারে নাÑএই মুহূর্তে ভারতের খেলা বন্ধ করতে হবে।’

শাইখুল হাদীসের এই বক্তব্য শেষ হতে না হতেই উত্তেজিত জনতা বায়তুল মোকাররাম থেকে এক দৌড়ে গিয়ে স্টেডিয়াম ঘেরাও করে। শুরু হয় স্টেডিয়ামের ভেতরে বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল নিক্ষেপ। স্টেডিয়ামের মেইন গেট পর্যন্ত বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ- ভারতের খেলা পাণ্ড হয়ে যায়। ভারতীয় দল কোনো রকম দ্রুত স্টেডিয়াম ত্যাগ করে ।
স্টেডিয়ামে হামলার পর সেখানে বড় আকারে সংঘর্ষ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা ইট-পাটকেল ছুঁড়ে স্টেডিয়ামের দিকে,  ভেতর থেকে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে থাকে, পাশাপাশি কিছু দর্শকও পুলিশের সাথে পাল্টা হামলায় যোগ দেয়। তাদের যোগ দেওয়ার কারণ, বিক্ষোভকারীদের হামলায় তাদের অনেকেও আহত হয়েছিল।

ধীরে ধীরে এই সংঘর্ষ বাইরে চলে আসে। এক সময় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পল্টন-গুলিস্তান-বায়তুল মোকাররম এলাকা। তাউহীদি জনতার সাথে যখন পুলিশের তুমুল সংঘর্ষ চলছে তখন অন্য নেতারা চলে গেলেও শাইখুল হাদীস সাহেব সেখানেই ছিলেন। কর্মীদের মাঠে নামিয়ে চলে যাওয়ার মানুষ তিনি নন। তিনি বায়তুল মোকাররামের সিঁড়িতেই বসা ছিলেন। ধাওয়া খেয়ে জনতা যখন আসতো, এসে দেখতো শাইখুল হাদীস  ময়দানে, তখন আবার তারা নতুন উদ্যোমে ফিরে যেতো। এভাবেই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত থেমে থেমে চলতে থাকে এই সংঘর্ষ। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও কাঁদানো গ্যাসের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় পল্টনের আকাশ। দুপুরের পর কিছু সময় পল্টন এলাকার পরিবেশ কিছুটা শান্ত হলেও বিকালের পর পরিবেশ আবারো উত্তাল হয়ে ওঠে। এভাবেই এ আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যায় দেশের আনাচে-কানাচে। কিন্তু এসব আন্দোলনে ভারতের কোনো ভ্রুক্ষেপ না করায় আরও কঠোর কর্মসূচির পথে হাঁটেন শাইখুল হাদীস।

তিন.
বাবরী মসজিদ নির্মাণের দাবিতে সারাদেশ যখন উত্তাল, ঠিক তখন চেতনায় আগুন ধরানোর মতো আরেকটি ঘটনা ঘটে। বাবরী মসজিদ আন্দোলনের অবিসংবাদিত রাহবার শাইখুল হাদীস হামলার শিকার হন। ১২ই ডিসেম্বর  জাতীয় শহীদ মিনার পেরিয়ে জগন্নাথ হলের সামনে দুষ্কৃতিকারীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

চকবাজার থেকে লংমার্চের কাজেই তিনি যাচ্ছিলেন মালিবাগের দিকে। সাথে ছিলেন জামি‘আ মুহাম্মাদিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবুল কালাম। শাইখুল হাদীসকে বহনকারী বেবিটেক্সি যখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির তীর্থভূমি শহীদ মিনার পেছনে ফেলে জগন্নাথ হল পার হচ্ছিল, তখন কিছু উচ্ছৃঙ্খল বেয়াদব যুবক বাবরী মসজিদ আন্দোলনের প্রতীক শাইখুল হাদীসকে পেয়ে তার ওপর আক্রমণ করে।

হামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী মাওলানা আবুল কালাম সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, চকবাজার থেকে বেবিটেক্সি নিয়ে আমরা শহীদ মিনার পর্যন্ত যাওয়ার পর দেখি সেখানে মিছিল হচ্ছে। মিছিলটি সম্ভবত হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ছিল। মিছিলের কারণে আমাদের বেবিটেক্সি হঠাৎ থেমে যায়। শাইখুল হাদীস সাহেব বলেন, থামলেন কেন যান। বেবিটেক্সি ধীরে ধীরে এগুতে থাকে। হঠাৎ কয়েকটি ছেলে এসে আমাদেরকে ঘিরে ধরে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। আমি চিৎকার করে বলি, আপনারা জানেন কাকে মারছেন? ইনি শাইখুল হাদীস, হাজার হাজার আলেমের উস্তাদ। হুজুরকে ছাড়েন। কে  শোনে কার কথা। আমার কথা কারও কানে ঢুকে না। আমি চিৎকার করতে থাকি।

শাইখুল হাদীসের হাতে তখন হাদিসে নববীর বঙ্গানুবাদ বাংলা বুখারি শরিফের পাণ্ডুলিপি। দুষ্কৃতিকারীরা পাণ্ডুলিপি টেনে ছিঁড়ে ফেলে, চোখের চশমা কেড়ে নিয়ে ভেঙে চুরমার করে। জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে আঘাতের পর আঘাত করে টেনে-হিঁচড়ে জগন্নাথ হলের ভেতর নিয়ে যেতে থাকে। উভয় হাঁটুর বিভিন্ন অংশ রক্তাক্ত হয়ে উপমহাদেশের অন্যতম এই শ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদ এক পর্যায়ে লুটিয়ে পড়েন রাস্তায়। তারা টেনে হলের ভেতরে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকে।

ভয়াবহ এই দৃশ্য দেখে এক ভদ্রলোক চিৎকার করে ছুটে যায় পুলিশের কাছে। পুলিশ দ্রুত শাইখুল হাদীসকে উদ্ধার করে নিকটস্থ থানায় নিয়ে যায়।

এই সংবাদ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শায়খুল হাদীসের অনুসারীরা রাস্তায় নেমে আসে। মানুষের ক্ষোভ তখন বিক্ষোভে পরিণত হয়।

এই সংবাদ শোনা মাত্রই নেতা কর্মীরা শাইখের বাসায় ভিড় করে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ভেতর থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বের হয়ে আসেন শাইখুল হাদীস। তখনো তার পা থেকে  টপটপ করে রক্তের ফোঁটা ঝরছে। নেতার রক্তাক্ত এই অবস্থা দেখে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন সবাই। চোখের পানিও সামলাতে পারেননি অনেকে।

রক্তাক্ত শাইখুল হাদীস তাদেরকে দেখে প্রথম কথা এই বলেন, তোমরা কেন এখানে আসছ, সাংবাদিক সম্মেলনের কী খবর? কাজ কত দূর হয়েছে? তার পা থেকে যে তখনো রক্ত ঝরছে সেই খবর নেই, তিনি অস্থির সাংবাদিক সম্মেলন ঠিকঠাক মতো হচ্ছে কি না তা নিয়ে।

শাইখুল হাদীসকে বলা হয়, হুজুর আপনার তো এখন হাসপাতালে যাওয়া দরকার। বিশ্রাম নেওয়া দরকার। আজ সাংবাদিক সম্মেলন কী করে হবে?

এমন কি তখন সাংবাদিকরা শাইখুল হাদীসকে আসতে মানা করে যে, হুজুরের আর আসার প্রয়োজন নেই। হুজুরের পক্ষে অন্য কেউ বক্তব্য রাখুক। কিন্তু শাইখুল হাদীস কোনোভাবেই তাতে রাজি হননি।

জবাবে তিনি বলেন, আমি সেই মানুষ না যে এই সামান্য ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে শুয়ে থাকব। ইসলামের জন্য আল্লাহর রাসূল ও সাহাবাগণ এর চেয়ে কতো বেশি ত্যাগ স্বীকার করছেন, আমার এটা কিছুই না, তোমরা যাও প্রোগ্রামের প্রস্তুতি নাও, আমি আসছি।

সিদ্ধান্তে হিমালয়সম অটল শাইখুল হাদীসের কণ্ঠে যেন দৃঢ়তা ঝরে পড়ছিল। অযোধ্যামুখী রক্তভেজা কদমগুলো যেন হামলার পর এখন আরও মজবুত। আরও কঠোর। লংমার্চ এবার হবেই। কেউ তা আটকে রাখতে পারবে না। কোনো হামলা-মামলা রুখতে পারবে না রাজপথ কাঁপানো সংগ্রামের এই স্ফুলিঙ্গ।

মাগরিবের পর সাংবাদিক সম্মেলন। পরিস্থিতি একেবারে তপ্ত আগুনের মতো। একে একে সবাই মঞ্চে উপস্থিত হচ্ছেন। নীরব, কিংকর্তব্যবিমূঢ় সবাই। চাতক পাখির মতো সবার কাতর অপেক্ষা শায়খুল হাদীসের জন্য, কী অবস্থায় আছেন তিনি? কখন আসবেন?

এমন সব ভাবনার মাঝেই  হাঁটু পর্যন্ত আবৃত খয়েরি রঙের ভারী এক শেরওয়ানি পরিহিত সংগ্রামী জনতার হৃদয় স্পন্দন শাইখুল হাদীস ধীরস্থির পদক্ষেপে কনফারেন্স কক্ষে ঢুকলেন। হলজুড়ে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা।

ধীরে ধীরে শাইখুল হাদীস মধ্যমণির আসন গ্রহণ করেন। শায়খুল হাদীসের ওপর হামলার বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী। তখন শাইখুল হাদীসের রক্তাক্ত জামা-কাপড়ও সাংবাদিকদের দেখানো হয়।
মূল বক্তব্য রাখেন শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.। তিনি প্রায় ৫ শ’ বছরের পুরোনো এই বাবরী মসজিদ ধ্বংসের তীব্র নিন্দা জানান এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে ভয়াবহ মুসলিম নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি এ সকল ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ২রা জানুয়ারি ঢাকা থেকে অযোধ্যা অভিমুখী যুগান্তকারী ঐতিহাসিক লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

তিনি হামলাকারীদের বিচারের সব দাবি উপেক্ষা করে নিঃশর্ত ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং তাদের জন্য হেদায়াতের দোয়া করেন। উপস্থিত সকলের মনে তখন দোলা দিয়ে যায় তায়েফের সেই কাহিনী। যেখানে কাফের-মুশরিকদের হাতে রক্তাক্ত হওয়ার পরও প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সেই তায়েফের মানুষের জন্যই বরং দোয়া করলেন। কোনো নালিশ করেননি আল্লাহর দরবারে।

চার.
২রা জানুয়ারি, ১৯৯৩ সাল। হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল জাতীয় মসজিদ বায়তুল  মোকাররমের সামনে। শুধু মানুষ আর মানুষ। জনসমুদ্রের মাঝ থেকে উঠে উদ্বোধনী ভাষণ দেন বাবরী মসজিদ আন্দোলনের অবিসংবাদিত সিপাহসালার শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.। তার হৃদয়বিদারক ভাষণ শুনে বাবরী মসজিদ ভাঙার ব্যথায় কেঁদেই ফেলেন অনেকে। দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এ লংমার্চ  পাশবিক শক্তির বিরুদ্ধে মানবতার মহাযাত্রা। আমাদের এ লংমার্চ  হবে অহিংস। সংখ্যালঘুদের অহেতুক ভয় পাওয়ার  কিছু নেই। কেননা  তাদের  বিরুদ্ধে এ আন্দোলন নয়।  শাইখুল হাদীস তার ভাষণে  জনগণকে গুজবে কান না দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে  বলেন,  আমরা  রাজপথে নেমেছি  এদেশে  ইসলাম  প্রতিষ্ঠা না করে ঘরে  ফিরছি  না।  তিনি  কর্মীদের  শুধুমাত্র  জিকিরের স্লোগান  নিয়ে এগিয়ে  যাবার আহ্বান জানান।

প্রধান অতিথি হিসেবে লংমার্চনেতার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যের পর দেশবরেণ্য আলেমদের নেতৃত্বে মহামুক্তির মিছিল শুরু হয়। জনতা সাগরে তখন জেগেছে উর্মি, নেমেছে লাখো মানুষের ঢল। তরঙ্গের পেছনে তরঙ্গ যেমন ধেয়ে আসে, ঠিক সেভাবে আসতে থাকে মিছিলের পর মিছিল। ঢাকার মানুষ এমন মিছিল আর কখনো দেখেনি।

পথে রাজবাড়ি, মাগুরা, ঝিনাইদাহসহ বেশ কয়েকটি স্থানে পথসভা হয়। পথসভাগুলোতে বক্তব্য রাখেন লংমার্চের আহ্বায়ক শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক। প্রতিটি এলাকা থেকেই প্রচুর সংখ্যক নেতা-কর্মী নতুন করে যোগ দিতে থাকেন।

পরদিন ৪ঠা জানুয়ারি সকাল ১০টায় যশোর বাস টার্মিনালে যখন সমাবেশ শুরু হয়, তখন যশোরের মাটিতে জনসমদ্রের উত্তাল তরঙ্গ। এত বিশাল সমাবেশ যশোরবাসী দ্বিতীয়টি দেখেনি। ঈদের জামাতে যেমন প্রতিটি মানুষ ঘর থেকে বের হয়, তেমনি চারদিক থেকে লাইন ধরে মানুষ আসতে থাকে। যারা সেদিন সেই সমাবেশে উপস্থিত ছিল তাদের বক্তব্য হচ্ছে, পুরো যশোরজুড়ে ছিল মানুষ আর মানুষ। যেন তিল ধারণেরও ঠাঁই নেই। মনে হচ্ছিল, গোটা যশোর জেলা পল্টন ময়দানের মত কোনো সমাবেশস্থল।

সমাবেশ শেষ করে কাফেলা যাত্রা শুরু করে অযোধ্যা অভিমুখে। মিছিল নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ ও ভাবগাম্ভীর্য সহকারে মুরুলি মোড় ঘুরে বেনাপোল সড়কের দিকে  এগোতে থাকে। বেলা ১টা ১০মিনিটে চাঁচড়া মোড়ে কাফেলা বাধার সম্মুখিন হয়। এ সময়ে পুলিশকে গাছের গুড়ি দিয়ে রাস্তায় ব্যরিকেড সৃষ্টি করতে দেখা যায়। কিন্তু কোনো কাজ হয় না। প্রলয়ঙ্করি তুফানের মতো কাফেলা সবকিছু তছনছ করে এগিয়ে যায়।
কিছু দূরে ফুলেরহাটে পুলিশ আরেকটি ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। এতে কোনোই কাজ হয় না। ১টা ১০ মিনিট  মূল কাফেলা আসার আগেই মিছিলের অগ্রবর্তী দল তা উপড়ে ফেলে। আরও সামনে এগিয়ে যায় কাফেলা।

লাখো জনতার এই স্রোত বানের মত ছুটতে থাকে অযোধ্যামুখে। ভয় নেই। শঙ্কা নেই। জানের প্রতি মায়া নেই। মুখে আছে জিকির। বুকে দৃঢ় শপথ আল্লাহর ঘর পুনর্নিমাণের। মসজিদ ভাঙার বেদনায় যেন সবাই বেকারারÑঅস্থির।
কাফেলার অগ্রযাত্রা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। এর আগেও অনেক ব্যরিকেড দেয়া হয়েছিল কোনো কাজ হয়নি। কাফেলা শুধু সামনে এগোতে থাকে। সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, ধোপাখোলা থেকে মিছিল আর সামনে এগোতে দেওয়া হবে না। সেখানে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অত্যন্ত মজবুত তিন স্তরের  ব্যারিকেড দেওয়া হয়। বাংকার খনন করা হয়। যেন অসম শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি। মিছিল যশোরের ধোপাখোলা মাঠে পৌঁছে জোহরের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষ করার সাথে সাথেই শুরু হয় পুলিশ ও বিডিআরের সম্মিলিত আক্রমণ। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে চার দিকে। টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় আঁধারে ঢেকে যায় সবকিছু। সংঘর্ষে অনেকেই আহত হয়। সেখানেই মিছিল কার্যত বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। সেই ব্যরিকেড ভাঙা অধিকাংশের পক্ষেই আর সম্ভবপর হয়নি। অনেকেই মনে করতে থাকে মিছিল এখানেই সমাপ্ত।

অধিকাংশ মানুষ সেখান থেকেই ফিরে আসে। কিন্তু অসিম সাহসী অপ্রতিরোধ্য একটি কাফেলা নিয়ে বাধার সব প্রাচীর ভেঙে বীর বিক্রমে এগিয়ে যায় শাইখুল হাদীস।
তখন লংমার্চের সিপাহসালার শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হককে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজতে থাকে। পুলিশ মনে করেছিল শাইখুল হাদীস আলাদা শান-শওকত নিয়ে আসবে, পুলিশের খুঁজে বের করতে কোনো সমস্যাই হবে না। কিন্তু শাইখুল হাদীস সাধারণ জনতার সাথে পায়ে হেঁটে কখন ব্যরিকেড পার হয়ে গেছে তা কেউ টেরই পায়নি। আল্লাহু আকবার ধ্বনি তুলে বীর বিক্রমে মিছিল এগিয়ে যায়। ঈমানের দৃঢ়তা মুমিনকে কতটা ভয়হীন, শঙ্কাহীন, শক্তিশালী করে দেয়, তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই সে দিনের মিছিলকারীদের দেখে। বাধা আসছে, ব্যরিকেড দেওয়া হচ্ছে। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না জনতাকে। যেন বাধভাঙা স্রোত।

লাউজানির রেলগেটের আগে আরেক বাধা অতিক্রম করে কাফেলা। সেখানেই আসরের নামাজ আদায় করা হয়। এভাবে ১২ কিলোমিটার পথ চলতে চলতে মিছিল যশোরের ঝিকরগাছা ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছে। সেখানে দেখা যায় ব্রিজের মধ্যে পুলিশের লম্বা লম্বা লরি এলোপাতাড়ি রেখে ব্যারিকেড সৃষ্টি করেছে। নদী পার হওয়ার কোনো পথ খোলা নেই।

নামাজের পরপরই কাফেলার একটা অংশ ঝিকরগাছা ব্রিজের ব্যাড়িকেড ভেঙে হাজের আলি বালুর মাঠে পৌঁছলে মিছিল পুলিশের দ্বারা আবার প্রচণ্ড বাধাগ্রস্থ হয়। শুরু হয় বেপরোয়া লাঠিচার্জ আর কাদানে গ্যাস নিক্ষেপ। কিছু যুবক এর প্রতিবাদ জানাতে থাকে। তখনই ঘটে যায় হৃদয় বিদারক ঘটনা। গোটা পৃথিবীকে হতবাক করে নিরস্ত্র এই মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে। ঝাঁঝরা হয়ে যায় হারুন, কামরুলসহ অসংখ্য যুবকের বুক।

গুলি বর্ষণের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কামরুল পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলছিল -ওরে ঘাতকরা, তোমরা কি মুসলমান নও? কালেমায় বিশ্বাসী নও? আমাদেরকে সামনে এগোতে দাও। পুলিশ এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে সরাসরি কামরুলের বুকে গুলি করে।

আল্লাহর জমিনে আল্লাহর ঘর রক্ষার এই সংগ্রামে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করেনি শহীদ কামরুল আর হারুনেরা। আল্লাহর রাহে প্রবহমান সে রক্তে ভিজে লংমার্চ লাভ করে শহিদি কাফেলার মর্যাদা।

এহেন পরিস্থিতিতে লংমার্চ নেতা শায়খুল  হাদীস অশ্র“ ভারাক্রান্ত  হৃদয়ে যশোর বেনাপোল সড়কে সমবেত লংমার্চ  কাফেলাকে  শান্ত  হবার  অনুরোধ জানান। এখানে  মাগরিবের নামাজ আদায় শেষে এক সংক্ষিপ্ত  ভাষণে  শান্তিপূর্ণ  জিকিরের মিছিলে  গুলিবর্ষণের জন্য বিএনপি  সরকারের তীব্র  নিন্দা  করে  শাইখুল হাদীস বলেন,  এর দায়  বিএনপি  সরকারকে  নিতেই হবে। বাবরী  মসজিদ  পুনরায়  নির্মিত না  হওয়া  পর্যন্ত  সার্ক  সম্মেলনে নরঘাতক  নরসিমাকে  আসতে দেয়া  হবে না।  যেকোনো  মূল্যে  তার  ঢাকা  আগমন  প্রতিহত করা  হবে।  জিকিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে এই ন্যাক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে শাইখুল হাদীস পরদিন যশোর জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকেন এবং তিনি  ৫  জানুয়ারি দেশব্যাপী  শোক  দিবস  এবং ১২  জানুয়ারি  বিক্ষোভ ও  বিমানবন্দর ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা  করেন ।

পাঁচ.
দুই দশক পর হলেও একটি প্রশ্ন এখন আমাদের মনে ঘুরেফিরে আসে। এই যে এত বড় একটি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হল, হারুন কামরুলের রক্তে ভিজে লংমার্চ লাভ করল শহীদি মর্যাদা। লংমার্চ পরবর্তী কারাবরণ করে এ আন্দোলনকে যে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন শাইখুল হাদীস। বিনিময়ে আমরা কী পেলাম, কী-ই বা আমাদের প্রাপ্য ছিল?

একথা সকলের জানা, উগ্রপন্থী হিন্দুদের টার্গেট শুধু বাবরী মসজিদ ছিল না, ধীরে ধীরে ভারতকে মসজিদশূন্য করাই তাদের দুষ্টচিন্তা। এর আগে তারা বেশ কিছু মসজিদ দখলও করেছে, এবার  তারা বাধার সম্মুখীন না হলে আরও কতো মসজিদ এভাবে শহীদ হতো  তা আল্লাহই ভালো জানেন।
তাছাড়া ভারতের সরকারি সহযোগিতায় একটি মসজিদ ধুলোয় মিশিয়ে দেয়ার মত ন্যাক্কারজনক ঘটনার যে প্রতিবাদ মুসলিম উম্মাহর কাছে কাম্য ছিল, এই লংমার্চ এবং সর্বশেষ শাহাদত বরণের মাধ্যমে সেই ঈমানি দায়িত্ব পালন হয়েছে। এতে সন্দেহ নেই। আমাদের বিশ্বাস, শহীদের রক্তে রঞ্জিত প্রায় চার লক্ষ জনতার এই কাফেলা দেড়শ কোটি মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করেছে। কিছুটা হলেও হক আদায় করেছে।

মনে রাখতে হবে, দীন ইসলামের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। এ পথ রক্তে রাঙা। সাহাবাদের যুগ থেকে নিয়ে প্রতিটি শতাব্দীর ইসলামের ইতিহাস শহীদের লাল কালিতেই লেখা। ইসলামি আন্দোলন করতে চাইলে এ পথেই হাঁটতে হবে। বারবার কারবরণ করে, শত নির্যাতন সহ্য করে, চার লক্ষ জনতার বিশাল কফেলা নিয়ে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে শাইখুল হাদীস এ কথাই প্রমাণ করেছেন, আমাদের এ দীক্ষাই দিয়েছেন।
আজ আমাদের মাঝে শাইখুল হাদীস নেই। চারিদিকে শূন্যতা। ইসলামি আন্দোলনের মাঠে হাহাকার। নেই বলিষ্ঠ কোনো উচ্চারণ। ত্যাগের নাজরানা। শাহাদাতের অমিয়সুধা। তবে কি আমরা হারিয়ে যাব ¯্রােতের সাথে। একেক করে বিলিয়ে দেব আমাদের সব অর্জন।

তাহলে রোজ হাশরে কী জবাব দেব আমরা কামরুল-হারুনদের মতো হাজারো শহীদের কাছে। কী জবাব দেব শায়খুল হাদীসের মতো পূর্ব পুরুষদেরকে। তারা যখন বলবেন দীন ইসলামের যে বৃক্ষ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে আমরা সজীব রেখেছিলাম। তোমরা সে আমানত কেন রক্ষা করলে না।

শায়খুল হাদীসের সেই ঐতিহাসিক লংমার্চ আমাদের ডাক দিয়ে যায় ত্যাগের, সংগ্রামের। যার যতটুকু সামর্থ আছে তার সবটুকু দিয়ে অন্যায়ের মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়ার। বাতিল যতো শক্তিশালীই হোক না কেন, যতো বাধাই আসুক না কেন আন্দোলনের পথ থেকে কখনোই পিছু হটা নয়। শহীদের রক্তে লেখা এ দাস্তান আমাদের এ শিক্ষাই দেয়।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here