মুফতি জাকারিয়া হারুন : গাঁ শিউরে উঠার মতো খবর, ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ছাত্র আবরার ফাহাদের পাশের রুমের একজন ছাত্র অনেকটা ভয়ে গতকাল দুপুরের পর আবরার মারা যাওয়ার আগের সময়ের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, আবরারকে যখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ডেকে নিয়ে যায় তখন থেকেই তার রুমমেটসহ অনেকেই আতঙ্কে ছিলেন। তারা যে তাকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলবে এমন ধারণা তাদের ছিল না। রাত যখন ২টা বাজে তখন আমাদের একজন সহপাঠী দেখেন আবরারকে তোশকের মধ্যে পেঁচিয়ে নেতারা সিঁড়ির মধ্যে ফেলে গেছেন। তখনো আবরার জীবিত ছিল। ওই সময়ও তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হতো তাহলেও মনে হয় আবরার বেঁচে যেতো। এর আগে নিহতের মামা এ প্রতিবেদককে বলেন, আবরারের মা রোববার রাত ৩টার পর আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, হলে আবরারের কী কেনো সমস্যা হয়েছে। এরপরই তিনি একটি মোবাইল নাম্বার দিয়ে আমাকে যোগাযোগ করতে বললেন। এরপরই আমি সকাল ৬টার দিকে এসে জানতে পারি আবরার রাতেই মারা গেছে।’ আমাদের দেশে ইদানীং পান থেকে চুন খসার ইস্যুকে কেন্দ্র করে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠছে কুলাঙ্গররা।

মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন অত্যন্ত দয়া-মায়া করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে।’ (সুরা : তীন : ৪) সুরা বনি ইসরাইলের ৭০ নম্বার আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদের স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’

অন্যায়ভাবে কাউকে সামান্য কষ্ট দেওয়াকে ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলাম মানুষের সম্মান রক্ষা করাকে আবশ্যক মনে করে। মানুষ হত্যা তো দূরের কথা। কোরআন বলে- একজন মানুষকে হত্যা করা পুরো জাতিকে হত্যার শামিল। আর এক জন মানুুষের জীবন রক্ষা করা পুরো জাতির জীবন রক্ষার ন্যায়। পবিত্র কোরআন বলে, ‘এ কারণেই বনি ইসরাইলিদের এ বিধান দিলাম যে নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল। যদি কেউ একটি প্রাণ রক্ষা করে সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করলো।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত : ৩২)

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নৃশংস শাস্তি হলো জাহান্নামের শাস্তি। মহান আল্লাহ মানুষ হত্যার শাস্তি ভয়াবহ জাহান্নামের কথা উল্লেখ করে ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন ঈমানদারকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম- সে চিরকাল সেখানেই থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্য কঠোর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন৷’ (সূরা নিসা : ৯৩)

মানব হত্যাকারীর জন্য কঠোর শাস্তির কথা হাদিস শরিফেও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘দুনিয়া ধ্বংস করে দেওয়ার চেয়েও মহান আল্লাহর কাছে ঘৃণিত কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।’ (তিরমিজি) কিয়ামতের দিন মানবহত্যার বিচার করা হবে সবার আগে। তারপর অন্যান্য অপরাধের বিচার করা হবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মোকদ্দমার ফয়সালা হবে, তা হলো রক্তপাত (হত্যা) সম্পর্কিত।’ (বুখারি)

ন্যূনতম নৈতিকতা ও মানবতার কোনো স্তরেই নিরপরাধ মানুষের হত্যা সমর্থন করা হয় না। সামান্য স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য, অন্যায় প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে যারা নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে তারা মানবতার শত্রু। সাম্য-সম্প্রীতির জন্য হুমকি। মানবতার ধর্ম ইসলাম মানুষের জানমাল রক্ষা করার জন্য সব ধরনের জুলুম, অন্যায় ও রক্তপাত নিষিদ্ধ করেছে। বিদায় হজের ভাষণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আজ এই পবিত্র দিনে পবিত্র মাসে এবং পবিত্র (মক্কা) শহরে তোমাদের জন্য যেমন (যুদ্ধবিগ্রহ ও অপকর্ম করা) অবৈধ, তেমনিভাবে তোমাদের জান ও মাল বিনষ্ট করাও অবৈধ।’ (বুখারি : ১৭৪১)

হত্যা কত ভয়াবহ! কত নৃশংস! কত অমানবিক! ইসলামী শরিয়াহ বলে, পৃথিবীর সব মানুষ মিলে যদি একটি অন্যায় হত্যাকান্ড  ঘটায়- তবে কিয়ামতের দিন সবাইকে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘যদি আসমান ও জমীনের সব অধিবাসী একজন মুসলমানকে অন্যায়ভাবে হত্যার জন্য একমত হয়, তবে আল্লাহ তাদের সবাইকে অবশ্যই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here