ব্যাংকবহির্ভূত ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালকরা নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এক্ষেত্রে কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করা হয়নি। এসব অর্থের পুরোটাই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

এসব ঋণের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে যথেষ্ট জামানত নেই। এগুলো এখন আদায় অযোগ্য ঋণে পরিণত হয়েছে। দুর্বল হয়ে পড়েছে আর্থিক ভিত্তি। পরিচালকদের লুটপাটের কারণে সাতটি প্রতিষ্ঠানই এখন পথে বসার উপক্রম।

পরিশোধ করতে পারছে না আমানতকারীদের অর্থ। ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়ে এখন ঋণখেলাপির তালিকায় উঠেছে ছয় প্রতিষ্ঠানের নাম। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিচালকরা প্রভাব খাটিয়ে, অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে এসব ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস থেকে ৫৭০ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) থেকে ৭০০ কোটি টাকা, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট থেকে ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট থেকে সাড়ে ৪৭ কোটি টাকা, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে ৩৫০ কোটি টাকা, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস থেকে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ও প্রাইম ফাইন্যান্স থেকে ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন পরিচালকরা।

এই সাত প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালকরা মোট ঋণ নিয়েছেন ৫ হাজার ৯৮৫ কোটি ৫০ লাখ (প্রায় ছয় হাজার কোটি) টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) মোট লিজ বা ঋণের পরিমাণ ৮৪১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালক মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আত্মীয়স্বজনের অনুকূলে ৫৭টি ঋণ বা লিজ নেয়া হয়েছে।

এর বিপরীতে বকেয়ার পরিমাণ ৬৪০ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৭৬ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের পরিমাণ ৯৬২ কোটি ২২ লাখ টাকা। যা মোট সম্পদের ৬৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ৫৭টি লিজের মধ্যে ৫৬টিই আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ হিসেবে শ্রেণিকৃত।

এর মধ্যে টেলিকম সার্ভিস এন্টারপ্রাইজ, আবদুল্লাহ ব্রাদার্স, রহমত উল্লাহ অ্যান্ড কোম্পানি ও টাওয়া বিল্ডার্সের ঋণ অনুমোদন এবং বিতরণের সময় নিয়ম-কানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। এসব ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং অপরাধ করা হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

যদিও মেজর (অব.) আবদুল মান্নান নামে-বেনামে ঋণ নেয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, তাকে পর্ষদ থেকে সরানোর পরই লুটপাট হয়েছে।

এদিকে বেনামে শেয়ার কিনে ২০১৫ সালের শেষদিকে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেন রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার বা পি কে হালদার। তারপর তিনিও এতে লুটপাট চালান। প্রতিষ্ঠানটির ঋণের একটি বড় অংশ গেছে তাদের পকেটে। এর পরিমাণ ২০০ কোটি টাকারও বেশি।

একই প্রক্রিয়ায় বেনামে শেয়ার কিনে এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার গ্রুপ। পর্ষদের দায়িত্বে বসান নিজেদের লোক। পর্ষদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন পি কে হালদার গ্রুপ।

যা প্রতিষ্ঠানটির মোট লিজ বা ঋণের ৬৫ দশমকি ৫৭ শতাংশ। লিজের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রশান্ত কুমার হালদার, প্রীতিশ কুমার হালদার, সুস্মিতা সাহা, উজ্জ্বল কুমার নন্দি, অমিতাভ অধিকারী, ওমর শরীফ, মৈত্রী রানী ব্যাপারী, শাহ আলম শেখ, রতন কুমার বিশ্বাস, স্বপন কুমার মিস্ত্রি, অবন্তিকা বড়াল, গোপাল গাঙ্গুলীর নামে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান খুলেন।

 

পি কে হালদার গ্রুপ এককভাবে নিয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে বকেয়া স্থিতির পরিমাণ ১৪৫ কোটি টাকা।

পি কে হালদার গ্রুপ প্রশান্ত কুমার হালদার, প্রীতিশ কুমার হালদার, সুস্মিতা সাহা, উজ্জ্বল কুমার নন্দী, অমিতাভ অধিকারী, ওমর শরীফ, মৈত্রী রানী ব্যাপারী, শাহ আলম শেখ, রতন কুমার বিশ্বাস, স্বপন কুমার মিস্ত্রি, অবন্তিকা বড়াল ও গোপাল গাঙ্গুলীসহ আরও কিছু নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পি এন্ড এল লিমেটড, নিউট্রিক্যাল লিমিটেড, দ্রিনান অ্যাপারেলস, আনান কেমিক্যালস, ওয়াকামা লিমিটেড, সুখদা প্রপার্টিজ, জিএন্ডজি এন্টারপ্রাইজ ও রেপটাইলস ফার্ম। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বকেয়ার পরিমাণ ৩৬০ কোটি টাকা।

প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের (পিএফআই) পরিচালকরা প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। এতে নিয়ম-কানুনের কোনো বালাই রাখা হয়নি। জামানত ছাড়াই পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ৫১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। যার সবগুলোই বর্তমানে আদায় অযোগ্য খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণিকৃত।

পিএফআইয়ের দুটি ঋণ ৪৪২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পিএফআই সিকিউরিটিজ ও প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ক্যাপিটালের নামে দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে ৩০৯ কোটি ৬ লাখ টাকার সুদ বিধিবহির্ভূতভাবে ব্লক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। যা প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিকভাবে দুর্বল করেছে। মেসার্স আশিক’স নামের ঋণটি এর পরিচালক মুসলিমা শিরিনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঋণ হওয়ার পরও তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করা হয়নি।

এছাড়া পিএফআই প্রোপার্টিজ, সৈয়দ তৈয়বুল বাশার, সৈয়দ আফতাবুল বাশার, মেসার্স আশিক নামে সর্বোচ্চ সীমার অতিরিক্ত ঋণ দেয়া হয়েছে। এগুলো সবই এখন মন্দ ঋণ হিসেবে শ্রেণিকৃত। এর সঙ্গে তৎকালীন একজন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ৭৪৮ কোটি টাকা। মূলত এগুলোই লুটপাট করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি পরিচালকরা নামে-বেনামে নিয়েছেন ৫৭০ কোটি টাকা।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here