মুফতি জাকারিয়া হারুন ।।

ঈদ। ঘরে ঘরে আনন্দের উৎসব। আনন্দের বর্ণিল আয়োজনে মেতে ওঠে মুসলিম জনপদ। কিন্তু করোনায় দেশের ছিন্নমূল, অসহায়দের দুঃসহ অবস্থা ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের করুণ অবস্থার বর্ণনা শুনলে গাঁ শিঁউরে উঠে। তাদের তিনবেলা খাবার ও মাথা গুঁজার একটু জায়গাই যেন ঈদ আনন্দ। দুঃখজনক হলেও তারা এ থেকে বঞ্চিত।
ছিন্নমূল এক নারী বলেন, ‘খাবার নাই, ঘর-বাড়ি নাই, ঈদ করমো কেমন করি?’ সে এ কথাগুলো বলার সময়, তাঁর পাশে আরও অনেক মানুষের ভিড় জমে। ঈদ প্রসঙ্গে কথা তুলতেই চারদিক থেকে তাঁরা সীমাহীন কষ্টের কথা বলতে শুরু করেন।

এ পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যহত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা মুসলমানেরা। পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার তারা। নিজ দেশে তাদের একটুখানি জায়গা হলো না। উদ্বাস্তের মতো ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে তাদের। মিয়ানমার সেনাবাহিনী উল্লাস করে তাদেরকে নির্মমভাবে মেরেছে। নাফ নদী পেরিয়ে এখন তারা আমাদের দেশের শরণার্থী শিবিরে দিনাতিপাত করছে।

তাদের চোখে-মুখে নির্যাতনের ছাপ। ঈদ আনন্দের লেশমাত্র তাদের মাঝে নেই। স্বজনহারা এ লোকগুলো নির্বাক। জন্মই যেন তাদের আমৃত্যু অপরাধ। হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী পুরুষকে হত্যার পর তাদের অনেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন দেশে। দেশটির সঙ্গে সীমান্ত থাকায় জাতিসংঘের নিবন্ধন অনুসারে অন্তত ৫ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা আরো বেশি।

লাখো লাখো রোহিঙ্গা মুসলমানকে ঘর-বাড়ি ছাড়া করেছে মিয়ানমার সরকার। তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে মৌলিক অধিকার বঞ্চিত করে রাষ্ট্রবিহীন এক নিরাশ্রয়ী জাতিতে পরিণত করেছে দেশটি। এদের অনেকে এক কাপড়ে নৌকায় করে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মারা গেছে। বাংলাদেশে যারা পালিয়ে আসছে তাদের সিংহভাগ নারী। এসব নারীরা জানাচ্ছেন, তরুণদের দেখা মাত্রই গুলি করে হত্যা করছে মিয়ানমারের পামর সেনারা। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় বাংলাদেশের হাসপাতালে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

ঈদ উৎসবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নীতি কত সুন্দর ছিল! তিনি ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যেতেন মিষ্টি জাতীয় কিছু খেয়ে। আর কোরবানির ঈদে কিছুই খেতেন না। বরং কোরবানির পশুর গোশত দিয়ে প্রথম আহার করতেন। এর পিছনে রয়েছে বিস্ময়কর রহস্য। কারণ হলো ঈদুল ফিতরের দিন গরীবের জন্য সকালেই সদকায়ে ফিতর আদায় করা হয়। আর ঈদুল আজহার দিন পশু কোরবানি করে গোশত গরীবদের মাঝে ভাগাভাগি করে দিয়ে তারপর মানবতার মুক্তির দূত রহমতের নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেতেন।

তাই আমাদের জন্যও কর্তব্য হলো, ঈদ উদযাপন পাশের বাড়ির অসহায়, দরিদ্র ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের সঙ্গে নিয়েই যেন করি। এটাই তো ইসলামের সুমহান শিক্ষা। পৃথিবীর সকল মুসলমান এক দেহের ন্যায়। যার এক অংশ আঘাত প্রাপ্ত হলে তার সারা শরীর আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তারা অনাহারে, অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে। আর আমরা আয়েশ করে ঈদ উদযাপন করবো এটা সামাজিক, মানবিক ও ইসলামের দিক দিয়ে অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার।

মুহাদ্দিস, জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া, গাজীপুর। 

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here