মুফতি জাকারিয়া হারুন।।

পুরো পৃথিবী এখন খাঁচায় বন্দি পাখির ন্যায়। এমন সঙ্কটকাল যাচ্ছেÑ যা অতীতে কখনও যায়নি। সামনের দিনগুলো আমাদের কাছে অস্পষ্ট। শঙ্কায় দিনাতিপাত করছে বনি আদম। স্থবির হয়ে পড়েছে সব কিছু। পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে যা কখনও ঘটেনি।

সবার এখন একটিই প্রশ্ন পৃথিবী কবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে? কার্যত এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। সর্বত্র করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে-ই। পৃথিবীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে এটা নিশ্চিত।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) আশঙ্কা করেছে বিশ্বের প্রায় ৩৩০ কোটি মানুষ বেকার হয়ে যেতে পারে। আইএলওর আশঙ্কা আংশিক সত্য হলেও বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে যাবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি কর্মহীন হয়ে পড়বে গার্মেন্টস শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিক। গার্মেন্টস শিল্পের পর সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। বর্তমানে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা, যা আমাদের অর্থনীতিতে বিপর্যয়ের একটি সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল আগে থেকেই। বর্তমান মহামারিতে এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। দেশের জন্য আরও একটি দুঃসংবাদ হচ্ছে সামনের দিনগুলোতে প্রবাসী আয় বা ফরেন রেমিট্যান্স মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।

করোনার হানা থেমে গেলেও তার নেতিবাচক প্রভাব হবে দীর্ঘস্থায়ী। করোনা বিশ্ব অর্থনীতিকে লÐভÐ করে দিয়েছে। তাই করোনা পরবর্তী বিশ্বে প্রতিদিন হয়তো আমাদের দেখতে হবে অনাহারে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই এবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তো দূরের কথা, অর্থনীতি আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে। ভয়াবহ মন্দা বিশ্বকে গ্রাস করবে বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের।

করোনা সঙ্কটে দরিদ্রদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করতে না পারলে অন্তত তিন কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ডবিøউএফপি। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বেসলে বলেন, বিভিন্ন দেশের সরকারের আর্থিক সহায়তায় বিশ্বে অন্তত ১০ কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয় ডবিøউএফপি। তার মধ্যে অন্তত ৩ কোটি মানুষ খাবার না পেলে অনাহারে মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। জীবন বাঁচাতে হলে তাদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশ্ব অর্থনীতির এ টালমাটাল পরিস্থিতিতে যাকাতের সুষ্ঠু বন্টন ও আদায় হতে পারে দরিদ্র শ্রেণীর জন্য কিছুটা আশার আলো। ইসলামের সোনালি যুগে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ করা হতো। হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.Ñএর শাসনামলে মিসরে জাকাত গ্রহণকারী পাওয়া যায়নি। ইসলামের আলোকে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের ফলে যাকাতদাতা ছিল, যাকাতগ্রহীতা ছিল না। ইতিহাসে এরূপ প্রমাণ আরো আছে। ইমাম মালেক রহ.Ñএর মতে, জাকাতের সম্পদ বিতরণের বিষয়টি ইসলামী সরকারের বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল। যারা হতদরিদ্র বা যেসব এলাকায় অভাবী মানুষের সংখ্যা অধিক, সরকার যত দিন প্রয়োজন মনে করবে তাদের মধ্যে যাকাত বণ্টন অব্যাহত রাখবে। (মুয়াত্তা মালেক, ১/৩৩৪)।

যাকাত ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান এবং ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘যাকাত’-এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পবিত্রকরণ ও বর্ধিতকরণ। পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় যাকাত প্রদানের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং ২৬ জায়গায় সালাতের পাশাপাশি যাকাতের উল্লেখ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যে ব্যক্তি সালাত আদায় করে অথচ যাকাত আদায় করে না, সে মুসলমান নয় এবং তার আমল তার কোনো উপকারে আসবে না। যাকাত যারা আদায় করেন তারা জান্নাতি। যারা যাকাত অস্বীকার করে তারা মুমিন নয়। যাকাতে বিশ্বাস করে কিন্তু আদায় করে না তারা মুনাফিক।

সামর্থ্যবানদের মধ্যে যারা যাকাত আদায় করে না তাদের জন্য বীভৎস শাস্তি নির্ধারিত। মহানবী সা. বলেন, আল্লাহ যাকে সম্পদ দান করেন, আর সে এর যাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার সম্পদকে মাথায় টাক পড়া সাপ বানিয়ে দেবেন, যার চেখের ওপর দুটো কালো দাগ থাকবে। এ সাপ তার গলায় বেড়িস্বরূপ করা হবে, মুখের দুই দিকে তাকে দংশন করতে থাকবে এবং বলবে- ‘আমি তোমার সম্পদ। আমি তোমার সঞ্চিত অর্থ।’(সহি বুখারি, হাদিস নং ১৩১৮)।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যাকাত সংগ্রহ করে বাস্তুহারা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষত মাদরাসা, এতিমখানা ও অনাথ আশ্রমের দুস্থ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণের ব্যবস্থা করলে এক দিকে শিক্ষার আলো যেমন ছড়াবে। এভাবে যাকাতচর্চার মাধ্যমে একটি দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

দক্ষ ও খোদাভীরু বিশেষজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী জাতীয় বাজেটে এবার থেকে যাকাত সম্পর্কে পূর্ণ একটি দিকনির্দেশনা থাকা উচিত। বাস্তব ক্ষেত্রেই যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি ও বাজেটের পথে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে হবে।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া,গাজীপুর।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here