করোনাভাইরাসে পুরো পৃথিবী অসহায়। বাদ যায়নি আমাদের এ দেশটাও। প্রতিদিনই অসংখ্য রোগী আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারাও যাচ্ছেন অনেক রোগী। এই দুঃসময়ে করোনায় আক্রান্তরোগীরা সামাজিক, পারিবারিকভাবে নানা ধরনের নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন।

বিস্ময়ের সাথে দেখতে হচ্ছে, করোনা আক্রান্ত বাবা-মার মরদেহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে সন্তান। ফেলে যাচ্ছে ঝোপঝাড়ে। মানবতার এ ক্রান্তিলগ্নে বসে থাকেননি কওমি সন্তানরা। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীদের সেবায় পুরো দস্তুর মাঠে নেমেছেন। তাদেরই একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মী মাওলানা জুনায়েদ আহসান। করোনারোগীদের সেবা দিচ্ছেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। মানুষের সেবার জন্য তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘বিডি আর্তসেবা ফাউন্ডেশন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

যমযম টোয়েন্টিফোরের সঙ্গে আলাপচারিতায় ফুটে উঠে তার কাজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা।

যমযম : কেমন আছেন?

জুনায়েদ : আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর রহমতে অনেক ভালো আছি।

যমযম : আপনার পরিচয় জানতে চাচ্ছি?

জুনায়েদ : আমার ডাক নাম জুনু। রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বরে কচুক্ষেত বাজারের উল্টো পাশে বসবাস করি। বাবা ডাক্তার মো. হাকিম শাহাব উদ্দিন এবং মা মোছা. সালমা বেগম। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট।

যমযম : কিভাবে আসলেন কুর্মিটোলা হাসপাতালে?

জুনায়েদ : আমাদের একজন স্বেচ্ছাসেবক বন্ধু শেখ ঈশান করোনা আক্রান্ত হয়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার কাছে আমি প্রায় আসতাম। তার কাছে একদিন জানতে চাইলাম আচ্ছা আমরা শুনি হাসপাতালে রোগীদের জন্য অক্সিজেন নেই, চিকিৎসা ঠিকমত পায় না, সঠিক বাস্তবতা কী? তখন সে আমাকে বলে, অক্সিজেন অনেক আছে। কিন্তু সেগুলো গেটের সামনে থাকে। অক্সিজেনের দরকার হলে নিজেরটা নিজেই এনে লাগাতে হয়। বয়স্ক ও বেশি অসুস্থ ব্যক্তিদের নিজেই অক্সিজেন নিয়ে এসে লাগানো সম্ভব না। আমি তাকে আরো জিজ্ঞেস করি আর কী কী সমস্যা? তখন সে বলে যেখানে নিজের পরিবার দূরে ঠেলে দিচ্ছে, সেখানে ডাক্তার, নার্স এবং ওয়ার্ডবয়রা কতটা ভালবাসা দেখাবে! সেই কারণে করোনা রোগীরা সঠিক সময়ে সঠিক সেবা পায় না। তখন আমি তাকে হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার কথা বলি। তখন সে আমাকে বারণ করে। এরপর একদিন সে আমাকে কল দেয়, আমি গিয়ে দেখি সে চরম অসুস্থ। বমি করছে বারবার। তখন আমি ভাবলাম পরিস্থিতি যতটা ভয়ংকর হোক, মৃত্যু ঝুঁকি থাকলেও কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতেই হবে। আমি যেহেতু কওমি মাদরাসার ছাত্র তাই আমার বিশ্বাস পৃথিবী উল্টে গেলেও আমার মৃত্যু যখন, যেখানে এবং যেভাবে লেখা আছে, সেভাবেই হবে। তাহলে আমি কেন এই রোগীদের সেবা দিচ্ছি না? বাবা-মাকে বললাম, তারা কিছুতেই রাজি না। অনেক বোঝানোর পর বাবা-মা একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে যখন দেখলো আমাকে কিছুতেই থামাতে পারছে না, তখন তারা বলে, তুমি যখন যেতেই চাও, তাহলে আর কি করা যাও, তবে সাবধানে থেকো।

যমযম : হাসপাতালে আপনি কোন ধরনের কাজ করছেন?

জুনায়েদ : প্রায় মাসব্যাপী একটানা দিন-রাতে করোনা রোগীদের সেবা করে যাচ্ছি। প্রতিদিন রাত ১২টায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি নতুন রোগী যারা আসছে, তাদের কারও কিছু লাগবে কি-না, কারো অক্সিজেন লাগবে কি-না, নতুন কোনো রোগী এলে সে যদি বয়স্ক হয়, তার সাথে যদি কোনো লোক না থাকে তার মোবাইলে আমার নাম্বার সেভ করে দিয়ে বলি যত রাতই হোক যে কোনো প্রয়োজনে কল দিবেন। প্রায় প্রতিদিন রাতেই আমাকে কেউ না কেউ কল করে বলে তার অক্সিজেন শেষ, তখন আমি দ্রুত তার অক্সিজেন লাগিয়ে দেই। কারও গরম পানি লাগলে এনে দেই। অনেকের কাছে টাকা থাকে কিন্তু ফলমূল আনার লোক নাই। তাদের ফলমূল এনে দেই। যার যখন যেটা প্রয়োজন আমার সাধ্যের মধ্যে থাকা সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করি। সবচেয়ে বড় যে কাজটা মহান আল্লাহ আমাকে দিয়ে করাচ্ছেন তা হলো- একজন করোনা আক্রান্ত রোগীকে মানসিক সার্পোট দেয়ার চেষ্টা করি। যেন সে আতঙ্কগ্রস্ত না থেকে নির্ভয়ে দিনাতিপাত করতে পারে।

যমযম : কোনো পারিশ্রমিক পাচ্ছেন?

জুনায়েদ : নাহ। কোনো টাকা পায়সা ছাড়াই এই কাজ করছি। প্রতিদান তো দেবেন মহান আল্লাহ। মানবিকতার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এ কাজ করে যাচ্ছি। তবে যেহেতু করোনা আক্রান্ত ও মারা যাওয়া রোগীদের নিয়ে কাজ করবো, ফলে আমার বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না, তাই আমাকে শুধু হাসপাতালে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে বলেছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমার কথায় রাজি হয়েছে।

যমযম : সবার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান?

জুনায়েদ : যারা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের আমরা যেন অবহেলা না করি। এটা একটা রোগ। এই রোগ যে কারো হতে পারে। যে আক্রান্ত হয়ে গেছেন তাকে আমরা যেন সেবা যত্ন দিয়ে ভালো করে তুলি। কারণ সে ভালো হয়ে ওঠলে তার দেওয়া প্লাজমা থেকে আপনার পরিবারের কেউ ভালো হয়ে ওঠতে পারে। ইনশাআল্লাহ একদিন হাসপাতালের বেড থেকে একটা লাশও নামাতে হবে না। হয়তো একদিন কোনো করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর খবরও পাওয়া যাবে না।

 

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here