মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী :

নফল নামাযে কুরআন দেখে পড়া প্রসঙ্গ এবং আজহারী সাহেবের সমীপে

* ইমাম মালেক রহ. মুয়াত্তা লেখার পর তৎকালীন বাদশা বললেন, আপনার এই কিতাবকে সব প্রদেশে ও শহরে প্রেরণ করি, মানুষকে সরকারি ফরমান জারি করে দেবো, সবাই যেন এই কিতাব মোতাবেক আমল করে।
ইমাম মালেক রহ. বললেন, এই কাজ করা যাবে না৷ ফেতনা হবে। কারণ, প্রত্যেক অঞ্চলে সাহাবি ও তাবেয়িদের মাধ্যমে একটা আমল প্রতিষ্ঠিত ও চালু হয়ে গেছে; যা হয়তো মুয়াত্তায় বর্ণিত হাদিসের বিপরীত। তখন ফেতনা ছড়াবে, ঝামেলা হবে।

* শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. “আল ইনসাফ” নামক কিতাবে লেখেন : যে এলাকায় একটি সুন্নাহ প্রচলিত আছে, সে এলাকায় গিয়ে যদি একই বিষয়ে ভিন্ন আরেকটি সুন্নাহ থাকে, সে সুন্নাহর দাওয়াত প্রদান করবে না৷ কারণ, এরদ্বারা মানুষের মাঝে ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠবে।

* কিছু কিছু সাহাবি হতে বিচ্ছিন্ন বা শায কিছু মত পাওয়া যায়, যা অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামের মতের বিপরীত। সেসব বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ না করাই উচিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবশ্যক। যেমন :
– বীর্যপাত ছাড়া সহবাস করলে গোসল ফরজ হবে না।
– আগুন দিয়ে রান্নাকরা খাবার খেলে অজু ভেঙে যাবে।
– লজ্জাস্থান স্পর্শ করলে অজু ভেঙে যাবে।
– রাসুল সা. একজন সাহাবির মাথায় হাত দিয়েছিলেন৷ যেখানে হাত পড়েছিল ওই অংশের চুল কাটাননি জীবনে৷

উদাহরণত এই চারটা বিষয় উল্লেখ করলাম৷ এমন উদাহরণ আরও অনেক।
তো এইক্ষেত্রে মূলনীতি হল, সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবায়ে কেরামের মত অনুযায়ী আমল করতে হবে। আর সাহাবিদের ওইসব বিচ্ছিন্ন মতামত বা আমলের ব্যাখ্যা আছে কিংবা একান্ত তাদের ব্যক্তিগত ইজতিহাদ।

জাকওয়ান রা. এর হাদিস ও ব্যাখ্যা
এবার আসুন নফল নামাযে কুরআন দেখে পড়া প্রসঙ্গে। মাত্র একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। হযরত আয়েশা রা. এর গোলাম হযরত জাকওয়ান রা. তারাবির নামাযে কুরআন দেখে পড়তেন।
এই বর্ণনার সবচেয়ে বড় উত্তর হল, এই মাসআলা রাসুল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত আমলের বিপরীত। কুরআন দেখে পড়া জায়েয হলে অবশ্যই আরও সাহাবির আমল থাকত; কারণ অধিকাংশ সাহাবি হাফেজ ছিলেন না।

তাই মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ জাকওয়ান রা. এর এই আমলের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যথা :
★ আল্লামা কাসানী রহ. লেখেন, এটাও সম্ভব যে, যাকওয়ানের কুর’আন দেখে পড়ার বিষয়ে আয়েশা সিদ্দীকা রা. অজ্ঞ ছিলেন। কেননা নামাযে দেখে কুর’আন পড়া তৎকালীন উলামায়ে কেরামের ঐক্যমতে মাকরুহ। যদি তিনি জানতেন তবে বিনা কারণে পুরো মাস এই মাকরুহ কাজে লিপ্ত থাকার সুযোগ দিতেন না। অথবা এই সম্ভাবনাও বিদ্যমান যে, যাকওয়ানে অবস্থা দু ভাগে বিভক্ত। এক. তিনি তারাবীহের ইমামতি করতেন। দুই.বাকি অন্যসময় মাসহাফে দেখে দেখে কুর’আন পড়তেন। ( দেখুনঃ বাদায়েউস সানায়ে’ ২য় খণ্ড ১৩৩/১৩৪ পৃষ্ঠা)

★ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রাহ. বলেন, যাকওয়ানের হাদীসের দ্বারা উদ্দেশ্যে হল, যাকওয়ান নামায শুরু করার পূর্বে কুর’আন দেখে আত্মস্থ করে নিতেন এবং নামাযে গিয়ে তা তিলাওয়াত করতেন। তিনি প্রতি দুই রাকাতে কী তিলাওয়াত করবেন তা নামাযের আগে মাসহাফ খুলে পোক্তা ইয়াদ করে নিতেন। রাবী এটাকেই বর্ণনার করতে গিয়ে বলেছেন যে, কুর’আন দেখে তিলাওয়াত করতেন। ( বিনায়া, ২/৫০৪)
আল্লামা আইনী ও কাসানীর এই অভিমতের পক্ষে নায়লুল আওতার নামক গ্রন্থে ইমাম শাওকানী রাহ উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. এর নামাজে তারাবীহের হাদীস উল্লেখ করেন কিন্তু সেখানে কুর’আন দেখে পড়া বা মুখস্থ পড়ার কোন আলোচনা উল্লেখ করেননি। ইমাম ইমাম হাজর আসকালানীও একই রকম রিওয়ায়েত নকল করেন। (দেখুন- নায়লুল আওতার, ৫৮৭, বাবু ইমামাতিল আবদ, আত্ব তালখীস, ২/১১০)

তাছাড়া কুরআন দেখে না পড়া সম্পর্কেও রেওয়ায়াত রয়েছে :

হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন :
: نَہَانَا أمیرُ المُوٴمِنِیْنَ عُمَرُ رضی اللّٰہ عنہ أَن یَوٴُمَّ النَّاسَ فِي الْمُصْحَفِ، وَنَہَانَا أَن یَّوٴُمَّنَا اِلَّا الْمُحْتَلِمُ․
অর্থাৎ আমিরুল মুমিনিন উমর রা. রাযি. ইমাম সাহেবকে নামাজে কুরআন দেখে পড়তে নিষেধ করেছেন৷ কিতাবুল মুসহাফ, ইমাম আবু দাউদ লিখিত, হাদিস নং ১৮৯)

কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বিখ্যাত তাবেয়ি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন :
إِذَا کَانَ مَعَہُ مَا یَقُوْمُ بِہِ لَیْلَہُ رَدَّدَہُ وَلاَ یَقْرَأُ فِي الْمُصْحَفِ
অর্থাৎ কেউ যদি কিয়ামুল লাইলে পড়ার মতো সামান্য কুরআন মুখস্থ থাকে, তাহলে সেটা বারবার পড়বে৷ তারপরও কুরআন দেখে পড়বে না৷

বিখ্যাত ফকিহ লাইস রহ. মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ এর ব্যাপারে বলেন :
أنَّہُ کَانَ یَکْرَہُ أَنْ یَّتَشَبَّہُوْا بِأَہْلِ الْکِتَابِ یَعْنِيْ أَنْ یَّوٴُمَّہُمْ فِي الْمُصْحَفِ
অর্থাৎ আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্য রেখে তিনি নামাজে কুরআন দেখে পড়াকে মাকরুহে তাহরিমি বলেছেন৷

আমাশ ইবরাহিম নাখাঈ থেকে বর্ণনা করেন :
کَانُوْا یَکْرَہُوْنَ أَنْ یَّوٴُمَّ الرَّجُلُ فِي الْمُصْحَفِ کَرَاہِیَةً شَدِیْدَةً أَن یَّتَشَبَّہُوْا بِأَہْلِ الْکِتَابِ“
অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম নামাজে কুরআন দেখে পড়াকে মারাত্মক অপছন্দ করতেন আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কারণে৷ (বক্তব্যগুলো ইমাম আবু দাউদ কিতাবুল মাসাহিফে উল্লেখ করেছেন৷ হাদিস নং ১৮৯, ১৯০, ১৯১।

🔸 এ ব্যাপারে শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানীর বক্তব্য বেশ লক্ষণীয়। তিনি বলেন, ” যাকওয়ানের ইমামতির ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এর উপর ভিত্তি করে ব্যাপকভাবে অনুমতি দেওয়া যায় না। যদি মসজিদের ইমামদেরকে অনুমতি দেয়া হয় তবে কুর’আন হিফজ বা সংরক্ষণের যাবতীয় কার্যক্রম আস্তে আস্তে নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। অথচ এটা নবী করীম সা. এর ইরশাদের বিপরীত। কেননা নবী করীম সা. ইরশাদ করেন, তোমরা কুর’আন সংরক্ষণ কর। ঐ জাতের কসম যার আয়ত্বে আমার জান, নিশ্চয় কুর’আন কারীম বিদায়ের ক্ষেত্রে ও লোকদের সীনা থেকে বের হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে উট তার বাঁধন থেকে পলায়ন করা থেকেও বেশি দ্রুততর।
আর একথাও সবার জানা যে, অসীলার বিধান আর মূল বস্তুর বিধান একই। উলামায়ে কেরাম বলেন, যেই অসীলার মাধ্যমে ওয়াজিব অবিশিষ্ট থাকে বা স্থাপিত হয় তাও ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত। আর যেই বস্তু কোন মসিবত বা গুনাহের মাধ্যম হয় সে কাজটাও গুনাহ। (ফাতহুর রাহমান, ১২৪-১২৫)

* খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. বলেছেন, জায়েয এবং সুন্নাহের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। জাকওয়ান রা. এর আমলের কারণে নফল সালাতে কুরআন দেখে পড়া জায়েয হলেও সুন্নাহ নয়। একটা বিচ্ছিন্ন মত।

হালাম, হারাম হলে করণীয়

শরিয়তের গ্রহণযোগ্য মূলনীতি হল, হালাম হারাম এবং জায়েয ও নাজায়েযের মাঝে মতানৈক্য হলে হারামই প্রাধান্য পায়। নফল নামাযে কুরআন দেখে পড়া নিয়ে মতানৈক্য হচ্ছে; একমতে জায়েয, আরেক মতে নাজায়েয। কিন্তু কুরআন না দেখে পড়লে তো কোনো মতানৈক্য থাকছে না, তখন নিশ্চিত জায়েয হচ্ছে।

* হযরত আলী রা. বলেন, “মানুষের আকল অনুযায়ী কথা বলো।”
বাংলাদেশের মানুষের আকল জ্ঞান এবং দীনি সমঝ কখনোই আরবের মতো নয়। আরবে বিভিন্ন তরিকায় নামায হচ্ছে। কেউ ফিরেও তাকাবে না। এসব বিভিন্নতা দেখে তারা অভ্যস্ত। সুতরাং বাংলাদেশে কুরআন দেখে পড়ার মাসআলা বয়ান করা কতটুকু যৌক্তিক?

মাওলানা দিলাওয়ার হোসেন সাঈদী সাহেবের ওয়াজের বয়স আপনার সাকুল্য বয়সের চেয়ে বেশি। তিনি সরাসরি একটা দলের রাজনীতি করতেন। তবুও তার কোনো বয়ান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়নি। নামাযের কথা বলেছেন তিনি, কিন্তু আমিন জোরে বা আস্তের কথা বলেননি। তিনিও তো রমজান ও তারাবির বয়ান করেছেন। কই, বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি তো।
আপনি তো জানেন, খুব কম মাসআলাই আছে, সেখানে এখতেলাফ নেই। এখতেলাফি বিষয় সাধারণ জনগণের সামনে বলা কি উচিত?

লাইভের এক পর্যায়ে আপনি স্বীকার করেছেন, “কুরআন দেখে পড়াকে রেওয়াজ দেওয়া যাবে না। কুরআন মুখস্থ করতে হবে।”
সুতরাং পাবলিকের সামনে বললে তো তারা স্বাভাবিক বিষয় মনে করবে।
মানুষ ইতিবাচক বিষয়গুলো গ্রহণ করে কম। নেতিবাচক ও বিতর্কিত বিষয় নিয়ে পড়ে থাকে। এই দেশে আপনার সমর্থকও কম নয় এবং বিরোধী পক্ষের লোকও কম না। সুতরাং মানুষের হাতে আলোচনা সমালোচনার বিষয় তুলে দেওয়া কতটুকু যৌক্তিক? রমজানের এই সময়ে সমালোচনার গণ্ডি পেরিয়ে গালিগালাজে চলে যাবে মানুষ।

আজহারী সাহেব!
আলোচক ও মুফতি—দুটি ভিন্ন বিষয়, এটা আপনিও জানেন। ফিকহ, উসুলে ফিকহ এবং বিশেষত মাকাসিদে শরীয়াহ সম্পর্কে আরও গভীর মোতালাআর দরখাস্ত। আপনি উপকৃত হবেন। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল, আপনার উস্তাদ বা উস্তাদ পর্যায়ের বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের সাথে নিয়মিত মশওয়ারা করেন, ইস্তেফাদা করেন।
জাযাকাল্লাহ খাইরান।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here