মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী : ফেতনা শব্দটি আমাদের কাছে বহুল ব্যবহৃত ও পরিচিত। আমার ফেতনার যুগে আছি, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ফেতনা কাকে বলে? ফেতনার আলামত কী কী? কোন কোন বিষয় প্রকাশিত হলে বুঝব আমরা ফেতনায় নিপতিত? ফেতনার সময় আমাদের করণীয় কী? এসব জানার জন্য মাও. তাকি উসমানি সাহেবের এ লেখাটি পড়লে উপকৃত হওয়া যাবে, ইনশাল্লাহ।
.
ভবিষ্যতে সংঘটিত অবস্থাসমূহের বর্ণনা রাসুল সা. কিভাবে দিলেন?
অতএব, তাঁর শিক্ষা ও তাঁর বর্ণিত বিধি-বিধান কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। কোনো যুগের সাথে তাঁর শিক্ষা সীমাবদ্ধ নয়। রাসুল সা. আমাদেরকে যে শিক্ষা দান করেছেন তা জীবনের সকল শাখায় পরিব্যাপ্ত। তাঁর শিক্ষার দুটি দিক আছে। একটি হল, শরিয়তের বিধি-বিধানের বর্ণনা। যেমন, অমুক জিনিস হালাল এবং অমুক জিনিস হারাম, এ কাজ জায়েজ এবং ঐ কাজটি নাজায়েজ, অমুক আমলটি ওয়াজিব, অমুক আমলটি সুন্নত এবং অমুক আমলটি মুসতাহাব। অন্যটি হল, মুসলিম উম্মাহ ভবিষ্যতে কী ধরনের অবস্থার মুখোমুখি হবে এবং তাদের উপরে কি কি বিপর্যয় আসবে এবং সে অবস্থায় করণীয় কি, তার বর্ণনা।
এ দ্বিতীয় দিকটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি ভবিষ্যতে সংঘটিত ঘটনাবলি সম্পর্কে আল্লাহর পক্ষা থেকে জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পর উম্মতকে জানিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে এই এই ঘটনা ঘটবে এবং সে অবস্থায় উম্মতের করণীয় কি তাও বাতলে দিয়েছেন। আজকে এ বিষয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা রাখব।

উম্মতের নাজাতের ফিকির
রাসুল সা. উম্মতের নাজাতের চিন্তায় সর্বদা ব্যাকুল থাকতেন। একটি হাদিসে আছে :
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , «مُتَوَاصِلَ الْأَحْزَانِ , دَائِمَ الْفِكْرِ
রাসুল সা. সর্বদা চিন্তান্বিত এবং দুঃখ-ভারাক্রান্ত থাকতেন। [আল-মুজামুল কাবির, হাদিস : ৪১৪]

মনে হতো সর্বদাই তাঁর উপর কোনো দুঃখ ছেয়ে আছে। এটা কিসের দুঃখ? যে সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছে তাদেরকে কীভাবে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো যায়, কীভাবে তাদেরকে ভ্রান্ত পথ থেকে সত্য-সুন্দর পথে নিয়ে আসা যায়, এটাই ছিল তাঁর চিন্তা ও দুঃখের একমাত্র কারণ। কুরআনুল কারিমে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেই ইরশাদ হয়েছে,
لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ
লোকেরা ইমান আনছে না বলে আপনি কি দুঃখে আত্মবিনাশী হয়ে পড়বেন? [সূরা শুআরা, আয়াত : ৩]।

এক হাদিসে আছে, রাসুল সা. বলেন, ‘আমার উপমা হল এক ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন প্রজ্বলিত করল এবং তা দেখে পতঙ্গসমূহ উড়ে এসে আগুনে পড়তে লাগল। লোকটি পতঙ্গগুলোকে দূরে রাখার চেষ্টা করে কিন্তু তারপরও সেগুলো আগুনে ঝাপ দেয়। এমনিভাবে আমিও তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি, তোমাদের কোমর ধরে ধরে বাঁধা দিচ্ছি কিন্তু এরপরও তোমরা জাহান্নামের আগুনে পড়ে যাচ্ছ।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুধু তাঁর যুগের লোকদের জন্য ফিকির ছিল তাই নয় বরং কেয়ামত পর্যন্ত আগত সকল উম্মতের জন্য সমান ফিকির ছিল।
.
ভবিষ্যতে কী কী ফেতনা দেখা দিবে

তাই রাসুল সা. আগত লোকদেরকে সমকালীন অবস্থা সম্পর্কে সর্তক করেছেন। এ সম্পর্কিত হাদিসগুলো হাদিসের প্রায় সকল গ্রন্থেই ‘কিতাবুল ফিতান’ নামে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে সন্নিবেশিত হয়েছে। রাসুল সা. ইরশাদ করেন :
إِنِّي لَأَرَى الْفِتَنَ تَقَعُ خِلَالَ بُيُوتِكُمْ كَوَقْعِ الْمَطَرِ
ভবিষ্যতে তোমাদের গৃহে বৃষ্টির ফোঁটার ন্যায় ক্রমাগত ফেতনা নিপতিত হতে দেখছি আমি। [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২১৮১০]

বৃষ্টির ফোঁটার সাথে আগত ফেতনাকে তুলনা করে দুইটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এক. বৃষ্টিতে পানির পরিমাণ যেরূপ অনেক থাকে তদ্রূপ ভবিষ্যতে ফেতনার পরিমাণও হবে অনেক। দুই. বৃষ্টির ফোঁটা যেরূপ ক্রমাগত ও বিরামহীন পড়ে, ফেতনাও তদ্রƒপ ক্রমাগত ও বিরামহীন আসবে। একটি ফেতনা শেষ না হতেই আরেকটি ফেতনা দেখা দিবে। দ্বিতীয়টি শেষ না হতেই তৃতীয়টি দেখা দিবে এবং এ ফেতনাগুলোর প্রভাব তোমাদের ঘরে এসে পড়বে। অন্য এক হাদিসে রাসুল সা. বলেন :
سَتَكُونُ فِتَنٌ كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ
অচিরেই আঁধার রাতের অন্ধকারচ্ছন্নতার মতো ফেতনা দেখা দিবে। [সুনানে তিরমিযি, হাদিস ২১৯৫]

অর্থাৎ অন্ধকার রাতে যেরূপ মানুষ রাস্তা খুঁজে পায় না, তদ্রূপ ফেতনার যুগে মানুষ কি করবে তা বুঝে উঠতে পারবে না। ফেতনা তোমাদের পুরা সমাজ ও পরিবেশকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ তোমাদের দৃষ্টিগোচর হবে না। রাসুল সা. ফেতনা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়ার দোয়া শিখিয়েছেন :
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الفِتَنِ، مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
“হে আল্লাহ, আমরা আগত ফেতনাসমূহ থেকে আপনার কাছে পানাহ চাই। যাহেরি ফেতনা থেকেও পানাহ চাই এবং বাতেনি ফেতনা থেকেও পানাহ চাই।” [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৭৭৮]

এ দোয়াটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়মিত পঠিত দোয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
.
ফেতনার কাকে বলে?
ফেতনা কি জিনিস? ফেতনা কাকে বলে? ফেতনার যুগে আমাদের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহুহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা কী? ফেতনা শব্দটি কুরআনুল কারিমে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ হয়েছে। সূরা বাকারায় ইরশাদ হয়েছে :
وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ
আল্লাহর কাছে ফেতনা হত্যা অপেক্ষা মারাত্মক। [সূরা বাকারা, আয়াত : ২১৭]

ফেতনা আরবি শব্দ। অভিধানে এর অর্থ হল, আগুনে গলিয়ে স্বর্ণ বা রূপার খাঁদ পরখ করা। পরবর্তীতে শব্দটিকে পরখ করা, যাচাই করা, পরীক্ষা করা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং ফেতনার অন্য অর্থ হল, পরখ করা ও পরীক্ষা করা। যখন মানুষ বিপদ-মসিবতে আক্রান্ত হয় কিংবা দুঃখ-বেদনার শিকার হয় তখন তার ভিতরগত অবস্থার একটি পরীক্ষা হয় যে, এরূপ অবস্থায় সে কী কর্মপন্থা অবলম্বন করে? সে কি ধৈর্য ধারণ করে, না ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে? আল্লাহ তাআলার অনুগত থাকে, না অবাধ্য হয়ে পড়ে? এ পরীক্ষাকেও ফেতনা বলা হয়।
.
হাদিস শরিফে ফেতনা শব্দের ব্যবহার

হাদিস শরিফে শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা হল, যখন এরূপ পরিস্থিতি দেখা দেয় যে, সত্যকে চেনা যায় না, হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করা মুশকিল হয়, সঠিক এবং ভুলের মাঝে পার্থক্য বাকি থাকে না, সত্য কোনটি এবং মিথ্যা কোনটি তা বুঝা যায় না, এরূপ পরিস্থিতিতে বলা এটি ফেতনার যুগ। এমনিভাবে যখন সমাজে পাপাচার, গুনাহ ও অশ্লীলতা ব্যাপকরূপ লাভ করে একেও ফেতনা বলা হয়। এমনিভাবে না হককে, হক মনে করা এবং প্রমাণহীন জিনিসকে প্রমাণিত মনে করা একটি ফেতনা। যেমন, বর্তমান যুগে দেখা যায়, কাউকে কোনো দীনি বিষয়ে বলা হল যে, এ কাজটি গুনাহ, নাজায়েজ বা বেদআত। উত্তরে সে বলে, আরে, এ কাজ তো সবাই করছে, যদি এটা গুনাহ বা নাজায়েজ হয় তা হলে সারা দুনিয়ার লোক এটা কেন করছে? এ কাজ তো সৌদি আরবেও হচ্ছে…। আজকের যুগে এটি একটি নতুন দলিল আবিষ্কৃত হয়েছে যে, আমরা সৌদি আরবে এ কাজ করতে দেখেছি। এর দ্বারা মনে করা হয়, সৌদি আরবে যেই কাজ হয় তা নিঃসন্দেহে সঠিক এবং বৈধ। অতএব, যে জিনিস দলিল ছিল না তাকে দলিল মনে করাও একটি ফেতনা।
.
দুই দলের লড়াই একটি ফেতনা

এমনিভাবে যখন দু’জন মুসলমান কিংবা মুসলমানদের দুটি দল পরস্পর লড়াই করে এবং একে অন্যকে হত্যা করতে উদ্যত হয় এবং জানা যায় না, কে ন্যায়ের উপর এবং কে অন্যায়ের উপর আছে, তা হলে এটিও একটি ফেতনা। এক হাদিসে রাসুল সা. বলেন :
إِذَا التَقَى المُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالقَاتِلُ وَالمَقْتُولُ فِي النَّارِ
যদি দুজন মুসলমান তরবারি নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করে তা হলে হত্যাকারী এবং নিহতব্যক্তি উভয়ই জাহান্নামে যাবে। এক সাহাবি জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসুল, হত্যাকারী জাহান্নামে যাবে, এটা তো ঠিক আছে; সে একজন মুসলমানকে হত্যা করেছে কিন্তু নিহতব্যক্তি কেন জাহান্নামে যাবে? উত্তরে রাসুল সা. বলেন, কারণ সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য তরবারি উত্তোলন করেছিল। যদি কৌশলে সে পরাজিত না হত তা হলে সেই তার সঙ্গীকে হত্যা করত। কিন্তু সে কৌশলে পরাস্ত হওয়ায় প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়। এদের কেউই আল্লাহর জন্য লড়াই করেনি বরং দুনিয়ার জন্য, ধন-সম্পদের জন্য কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লড়াই করছিল এবং একে অপরের রক্তপিপাসু ছিল। অতএব দুজনেই জাহান্নামে যাবে। [সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১]
.
গুম, হত্যা ও লুটতরাজ একটি ফেতনা

অন্য এক হাদিসে রাসুল সা. বলেন :
إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ أَيَّامًا، يُرْفَعُ فِيهَا العِلْمُ، وَيَنْزِلُ فِيهَا الجَهْلُ، وَيَكْثُرُ فِيهَا الهَرْجُ وَالهَرْجُ, القَتْلُ
তোমাদের পরে এমন একটি যুগ আসবে যখন ইল্ম তুলে নেওয়া হবে এবং হারায’র সংখ্যা অনেক বেশি হবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হারায কী জিনিস? রাসুল সা. বলেন, হত্যা ও লুটতরাজ। অর্থাৎ সেই যুগে গুম, হত্যা ও লুটতরাজ এত বেশি হবে যে, মানুষের জীবন মশা-মাছির চেয়েও মূল্যহীন হবে। [সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭০৬২]।
অন্য এক হাদিসে রাসুল সা. বলেন :
يَأْتِيَ عَلَى النَّاسِ يَوْمٌ لَا يَدْرِي الْقَاتِلُ فِيمَ قَتَلَ، وَلَا الْمَقْتُولُ فِيمَ قُتِلَ ” فَقِيلَ, كَيْفَ يَكُونُ ذَلِكَ؟ قَالَ, الْهَرْجُ، الْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ
একটি যুগ এরূপ আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না কেন সে হত্যা করেছে এবং নিহত ব্যক্তি জানবে না কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে। [সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯০৮]।

বর্তমান যুগের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে মনেুল সা. এ যুগের অবস্থা দেখে উপরিউক্ত কথাটি বলেছেন। আগের যুগে যেটা হত, হত্যাকারী কে, এটা জানা না গেলেও কেন হত্যা করা হয়েছে তা জানা যেত। উদাহরণত, শত্রুতার জেরে হত্যা করা হয়েছে কিংবা ডাকাতরা হত্যা করেছে কিংবা ধন-সম্পদ রক্ষা করতে যেয়ে নিহত হয়েছে; নিহত হওয়ার কারণ প্রকাশ হয়ে পড়ত। কিন্তু বর্তমান অবস্থা হল, এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে; তার সাথে কারো লেনদেন নেই, কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে তার সম্পৃক্ততা নেই, কারো সাথে বিবাদ নেই; ব্যস শুধু শুধু মারা পড়ল।
.
মক্কা শরিফ সম্পর্কে একটি হাদিস

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন মক্কা শরিফের উদর বিদীর্ণ করা হবে এবং তার মধ্য দিয়ে নদীর মত প্রশস্ত রাস্তা তৈরি হবে আর নির্মিত ভবনগুলো মক্কা শহরের পাহাড়গুলোর চেয়ে উঁচু হবে তখন মনে কর ফেতনার সময় সন্নিকটে।
আজ থেকে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত এ হাদিসের সঠিক অর্থ মানুষের বুঝে আসেনি, এখন সবাই বুঝেছে।

মক্কা শরিফের ভূমি বিদীর্ণ হওয়া

আলোচ্য হাদিসটি চোদ্দশ বছর যাবত হাদিসের কিতাবে সংকলিত হয়ে আসছে। হাদিসটির ব্যাখ্যা দানের সময় হাদিসের ব্যাখ্যাকারগণ বিস্মিত হতেন যে, মক্কা শহরের উদর কীভাবে বিদীর্ণ হবে? এবং নদীর মত রাস্তা হওয়ার অর্থ কি? কিন্তু আজকের মক্কা শহরকে দেখলে মনে হব আজকের মক্কা শহরকে দেখে উপরিউক্ত কথা বলেছেন। আজকে মক্কা শরিফের ভূমি বিদীর্ণ করে অসংখ্য সুরঙ্গ-পথ নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্বেকার হাদিসের ব্যাখ্যাকারগণ আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যা দানকালে বলতেন, এখন তো মক্কা শরিফ পাথুরে ভূমি এবং পাহাড়ী এলাকা তবে ভবিষ্যতে কোনো কালে আল্লাহ তাআলা এ শহরে নদী এবং খাল-বিল সৃষ্টি করবেন কিন্তু আজকের সুরঙ্গ-পথগুলো দেখে বুঝা যাচ্ছে যে, কীভাবে মক্কা শরিফের ভূমি বিদীর্ণ করা হয়েছে।

বিল্ডিংসমূহ পাহাড়ের চেয়ে উঁচু হওয়া

আলোচ্য হাদিসের দ্বিতীয়াংশে রাসুল সা. বলেছেন, যখন মক্কা শরিফের ভবনগুলো এর পাহাড়গুলোর চেয়ে উঁচু হবে…।
কয়েক বছর আগেও কেউ ভাবতেই পারেনি যে, মক্কা শরিফে পাহাড়ের চেয়েও উঁচু কোনো ভবন নির্মিত হবে। কারণ পুরা মক্কা শরিফ পাহাড়ী এলাকার মাঝে অবস্থিত। কিন্তু আজকে গিয়ে দেখুন, পাহাড়ের চেয়ে উঁচু উঁচু কত ভবন নির্মিত হয়েছে।
উপরিউক্ত হাদিসগুলো থেকে বুঝা যায় যে, চোদ্দশত বছর আগেই রাসুল সা. আজকের অবস্থা স্বচক্ষে দেখে তা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহপ্রদত্ত অহি ও ইলমের মাধ্যমে এ সব অবস্থা দিবালোকের ন্যায় তাঁর কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং তিনি প্রতিটি বিষয়ে খুলে খুলে আগত উম্মতের জন্য বলে গেছেন।
.
হাদিসের আলোকে বর্তমান যুগ

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে সকল হাদিসে আগত ফেতনাসমূহের কথা বর্ণিত হয়েছে সেগুলো মুসলমানদের বিশেষভাবে স্মরণ রাখা উচিত। হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ লুধিয়ানবী রহ. ‘হাদিসের দৃষ্টিতে বর্তমান যুগ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটিতে তিনি ফেতনার যুগ সম্পর্কিত প্রায় সকল হাদিসগুলো একত্র করেছেন। তাতে তিনি এমন একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, যাতে রাসুল সা. ফেতনার যুগের বাহাত্তরটি আলামত বলেছেন। হাদিসটি পড়ুন এবং আজকের অবস্থা মিলিয়ে দেখুন। দেখবেন, আজকের অবস্থার সাথে হাদিসের বক্তব্যের কি চমৎকার মিল!

ফেতনার বাহাত্তরটি নিদর্শন

হযরত হুজায়ফা রা. বলেন, কেয়ামতের পূর্বে বাহাত্তরটি বিষয় প্রকাশ পাবে :
১. লোকেরা নামাজে ডাকাতি করবে। অর্থাৎ নামাজের প্রতি মানুষের একদম গুরুত্ব থাকবে না। এ কথাটি আজকের যুগে এতটা আশ্চর্যের নয়। কারণ এ যুগে অধিকাংশ মুসলমানের মাঝেই নামাজের গুরুত্ব নেই। রাসুল সা. যখন এ কথা বলেছিলেন তখন নামাজ ইমান এবং কুফুঁরের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী বিষয় ছিল। সে যুগে একজন মুসলমান যত খারাপই ছিল না কেন, যত মারাত্মক বদকার ও ফাসেকই ছিল না কেন, তারা কিছুতেই নামাজ ছাড়তেন না। সে যুগে রাসুল সা. এ কথাটি বলেছিলেন। তখন মানুষ নামায ছাড়ার কল্পনাও করতে পারত না।
২. আমানতের খেয়ানত করবে। অর্থাৎ তাদের কাছে আমানতরূপে যা কিছু রাখা হবে তা তারা আত্মসাৎ করবে।
৩. সুদের লেনদেন করবে।
৪. মিথ্যা কথা বলাকে হালাল মনে করবে। অর্থাৎ মিথ্যা বলতে পারাকে একটি দক্ষতা ও যোগ্যতা মনে করা হবে।
৫. সামান্য বিষয়ে রক্তপাত করবে এবং অন্যের প্রাণ সক্সঘার করবে।
৬. উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ করবে।
৭. দীন বিক্রি করে দুনিয়া উপার্জন করবে।
৮. আত্মীয়দের সাথে বাজে আচরণ করবে।
৯. ইনসাফ উঠে যাবে।
১০. মিথ্যা সত্যতে পরিণত হবে।
১১. রেশমি পোশাক পরিধান করা হবে।
১২. জুলুম-অত্যাচার ব্যাপকরূপ লাভ করবে।
১৩. তালাকের আধিক্য হবে।
১৪. আকস্মিক মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে।
১৫. দুর্নীতিপরায়ণ লোকদেরকে সৎলোক মনে করা হবে।
১৬. সৎলোকদেরকে দুর্নীতিপরায়ণ মনে করা হবে।
১৭. মিথ্যাকে সত্য মনে করা হবে।
১৮. সত্যকে মিথ্যা বলা হবে।
১৯. অপবাদ আরোপের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
২০. বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও পরিবেশ উষ্ণ থাকবে।
২১. লোকেরা সন্তান লাভের পরিবর্তে সন্তান নেওয়াকে অপছন্দ করবে। অর্থাৎ সন্তান লাভের জন্য মানুষ যেভাবে দোয়া করে তার পরিবর্তে সন্তান না হওয়ার জন্য দোয়া করবে এবং বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করবে। যেমন, আজকাল পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়।’
২২. নীচ লোকেরা সম্পদশালী হবে এবং অত্যন্ত বিলাসী জীবনযাপন করবে।
২৩. ভদ্রলোকেরা নিগৃহীত হবে।
২৪. রাষ্ট্রপ্রধান, শাসকবর্গ ও মন্ত্রিপরিষদ এবং তাদের সমর্থক ও সহযোগীরা মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে এবং সকাল-বিকাল মিথ্যা কথা বলবে।
২৫. আমানতদার ব্যক্তি খেয়ানত করবে।
২৬. নেতৃবর্গ জালেম ও অত্যাচারী হবে।
২৭. আলেম এবং কারী বদকার হবে। অর্থাৎ আলেম এবং কুরআন শরিফ তেলাওয়াতকারী লোকজনও করে কিন্তু বদকার ও ফাসেক হবে।
২৮. লোকেরা জীবজন্তুর চামড়া দ্বারা তৈরি উন্নতমানের পোশাক পরবে।
২৯. কিন্তু তাদের দিলগুলো মৃত জন্তুর চেয়ে বেশি দুর্গন্ধময় হবে।
৩০. এবং পাথরের চেয়ে বেশি কঠিন হবে।
৩১. স্বর্ণ সুলভ হবে।
৩২. রূপার মূল্য বেড়ে যাবে।
৩৩. গুনাহর পরিমাণ বেড়ে যাবে।
৩৪. জানমালের নিরাপত্তা কমে যাবে।
৩৫. কুরআন শরিফকে সজ্জিত করা হবে।
৩৬. মসজিদকে কারুকার্যময় করা হবে।
৩৭. উঁচু উঁচু সৌধ নির্মিত হবে।
৩৮. হৃদয়গুলো উজাড় হবে।
৩৯. ব্যাপকভাবে মদ পান করা হবে।
৪০. শরিয়তের দণ্ডবিধিকে অকার্যকর করা হবে।
৪১. দাসীকে স্বীয় মুনিবকে জন্ম দিবে। অর্থাৎ মেয়ে মায়ের উপর কর্তৃত্ব করবে এবং এরূপ ব্যবহার করবে, যেরূপ মুনিব দাসীর সাথে ব্যবহার করে।
৪২. একসময় যারা খালি পায়ে ও উন্মুক্ত দেহে চলাফেরা করত এরূপ নীচ শ্রেণির লোকেরা দেশের শাসক বনে যাবে।
৪৩. পুরুষ ও মহিলা যৌথভাবে ব্যবসায় করবে। মহিলারা জীবনের সকল ক্ষেত্রে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।
৪৪. পুরুষরা মহিলাদের বেশভূষা ধারণ করবে।
৪৫. মহিলারা পুরুষদের বেশভূষা ধারণ করবে। দূর থেকে দেখে বুঝা যাবে না, এটা পুরুষ না মহিলা।
৪৬. গায়রুল্লাহর নামে শপথ করা হবে। শপথ শুধু আল্লাহর নামে এবং কুরআনের উপর বৈধ, অন্য কোনো কিছুর নামে শপথ করা হারাম। কিন্তু ফেতনার যুগে মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য জিনিসের নামেও শপথ করবে।
৪৭. মুসলমানরাও বলা ছাড়াই মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত থাকবে।
৪৮. শুধু পরিচিত লোকদেরকে সালাম দেওয়া হবে। অথচ রাসুল সা. এর শিক্ষা হল :
السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ
তুমি যাকে চেনো তাকেও সালাম করো এবং যাকে তুমি চেন না তাকেও সালাম করো। [সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২]
বিশেষ করে পথ চলার সময় পথে কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে তাদের সকলকে সালাম করা উচিত। কিন্তু গমনাগমনকারী লোকদের সংখ্যা অনেক বেশি হলে এবং সালামের কারণে নিজের কাজে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তখন সালাম না দেওয়ারও অবকাশ আছে। কিন্তু একটা সময় আসবে যখন গমনাগমনকারীদের সংখ্যা এক-দুজন হলেও সালাম দেওয়া হবে না; সালামের রেওয়াজ একবারেই উঠে যাবে।
৪৯. দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে দীননি ইলম শিক্ষা দেওয়া হবে। শিক্ষা অর্জনকারীদের উদ্দেশ্য হবে এর মাধ্যমে আমাদের ডিগ্রী লাভ করা, চাকরি পাওয়া, পয়সা উপার্জন করা এবং সম্মান ও খ্যাতি অর্জিত হওয়া।
৫০. আখেরাতের কাজের দ্বারা দুনিয়া উপার্জন করা হবে।
৫১. জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নিজের সম্পদ মনে করা হবে।
৫২. আমানতের মালকে লুটের মাল মনে করা হবে।
৫৩. জাকাতকে জরিমানা মনে করা হবে।
৫৪. সমাজের সবচেয়ে নীচ ও নিকৃষ্ট ব্যক্তিকে লোকেরা নিজেদের নেতা বানাবে।
৫৫. মানুষ নিজের পিতার অবাধ্যতা করবে।
৫৬. এবং মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করবে।
৫৭. বন্ধুদের ক্ষতি করতে দ্বিধা করবে না।
৫৮. স্ত্রীর আনুগত্য করবে।
৫৯. বদকার লোকেরা মসজিদে শোরগোল করবে।
৬০. গায়িকা মহিলাদের সম্মান করা হবে। অর্থাৎ যে মহিলারা গান-বাজনার পেশায় থাকবে তাদেরকে সম্মানের চোখে দেখা হবে।
৬১. বাদ্যযন্ত্র এবং বাজনার বিভিন্ন উপকরণকে বিশেষ যত্ন করা হবে।
৬২. রাস্তার মোড়ে মোড়ে মদের দোকান হবে।
৬৩. জুলুম-অত্যাচার করাকে গর্বের বিষয় মনে করা হবে।
৬৪. আদালতে ন্যায়বিচার বিক্রি হবে। অর্থাৎ বিচারপ্রার্থী ন্যায়ের উপর হলেও পয়সা দিয়ে রায় নিজের পক্ষে নিতে হবে।
৬৫. পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
৬৬. কুরআন শরিফকে গানের সুরে তিলাওয়াত করা হবে। কুরআনকে বুঝার জন্য অথবা সাওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে কিংবা দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করা হবে না।
৬৭. হিংস্র পশুর চামড়া ব্যবহার করা হবে।
৬৮. উম্মতের শেষ যুগের লোকেরা প্রথম যুগের লোকদের উপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করবে। তাদের সমালোচনা করবে এবং বলবে, তারা এই এই কথা ভুল বলেছে। আজকের যুগে দেখা যায়, উম্মতের শ্রেষ্ঠ জামাত সাহাবায়ে কিরামের সাথে অনেকে বেয়াদবি করছে। যাদের মাধ্যমে আমরা দীন পেয়েছি, তাদেরকে বেকুব, মূর্খ ও ধর্মান্ধ বলছে।
৬৯. হয়ত তোমাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে লালবর্ণের তুফান আসবে।
৭০. অথবা ভূমিকম্প আসবে।
৭১. অথবা লোকদের চেহারা বিকৃত হবে।
৭২. অথবা আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হবে। কিংবা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অন্য কোনো আজাব আসবে।
এসব আলামতগুলো নিয়ে একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে আমাদের সমাজে প্রতিটি আলামত বিদ্যমান এবং সমাজে বর্তমানে যে অশান্তি বিরাজ করছে তা মূলত উপরে বর্ণিত বদআমলগুলোরই ফল।
.
মসিবতের পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে

অন্য একটি হাদিসে হযরত আলি রা. বলেন, রাসুল সা. ইরশাদ করেন, যখন আমার উম্মতের মাঝে বারোটি [অন্য বর্ণ নায় পনেরোটি] কাজ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে তখন তাদের উপর মসিবতের পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, কাজগুলো কী?
উত্তরে রাসুল সা. বলেন :
১. যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদকে লুটের মাল মনে করা হবে…। দেখুন আজকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করা হচ্ছে। এটা শুধু শাসকবর্গের সাথে সীমাবদ্ধ নয় বরং যখন ক্ষমতাসীনরা লুটপাট করে তখন জনসাধারণের মধ্য থেকে যারা সুযোগ পায় তারাও লুটপাট করে। অনেক কাজই এরূপ আছে যার কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আমরা এ বিষয়টিকে বিলকুল পরোয়া করি না। যেমন, বিদ্যুৎ চুরি; বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ নিয়ে পুরোদমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদে চুরি। এমনিভাবে সরকারি টেলিফোন রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করা ও টিকেট ছাড়া ট্রেনে সফর করা কিংবা সেকেন্ড ক্লাসের টিকেট কেটে ফার্স্ট ক্লাসে ভ্রমণ করাও রাষ্ট্রীয় সম্পদে চুরি করা।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করা সাধারণ চুরির চেয়ে বেশি মারাত্মক। কারণ কেউ যদি কোনো মানুষের ঘরে চুরি করে এবং পরবর্তীতে তার ক্ষতিপূরণ দিতে চায় তা হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সহজ; যত টাকা সে চুরি করেছে ঐ পরিমাণ টাকা ফেরত দিয়ে দিবে অথবা তার কাছে যেয়ে মাফ করিয়ে নিবে যে, ভুলে আমার থেকে কাজটি হয়ে গেছে, আমাকে মাফ করুন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনগণের; রাষ্ট্রের অর্ন্তগত কোটি কোটি মানুষ এ সম্পদের অংশীদার। যদি কেউ এ সম্পদ চুরি করে কিংবা অপচয় বা অপব্যয় করে তা হলে ক’জনের কাছ থেকে সে মাফ নিবে? যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল জনগণ থেকে মাফ না করাবে ততক্ষণ পর্যন্ত চুরির অপরাধ মাপ হবে না। তাই সাধারণ চুরি অপেক্ষা রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করার পর মাফ নেওয়া অনেক কঠিন। আল্লাহ তাআলার কাছে এ থেকে পানাহ চাই।
২. যখন আমানতের মালকে লুটের মাল মনে করা হবে এবং তাতে খেয়ানত করবে।
৩. যখন লোকেরা জাকাতকে জরিমানা এবং ট্যাক্স মনে করবে।
৪. মানুষ স্ত্রীর আনুগত্য করবে এবং মায়ের অবাধ্যতা করবে অর্থাৎ মানুষ স্ত্রীকে খুশি করার জন্য মাকে অসন্তুষ্ট করবে।
৫. মানুষ বন্ধুর সাথে ভালো ব্যবহার করবে এবং পিতার সাথে অসদ্ব্যবহার করবে অর্থাৎ বন্ধুর সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করবে কিন্তু পিতার সাথে রূঢ় ও কঠোর আচরণ করবে।
৬. মসজিদে শোরগোল হবে। মসজিদ বানানো হয় আল্লাহর যিকির করার জন্য। ইবাদতকারী ও যিকিরকারীদের ইবাদত ও যিকিরে যাতে কোনোরূপ বিঘ্ন না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রতিটি মুসল্লির কর্তব্য। কিন্তু লোকেরা মসজিদে উঁচু আওয়াজে কথা বলে এবং শোরগোল করে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। আলহামদু লিল্লাহ, আজকাল তো মসজিদে বিবাহ পড়ানোর রেওয়াজ চালু হয়েছে। এটা ভালো, কিন্তু বিবাহের সময় মসজিদের সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয় না; অনেক শোরগোল করা হয়। কিছু কিছু গুনাহ আছে যেগুলো করতে আনন্দ ও মজা লাগে কিন্তু এটি এমন এক গুনাহ, এটি করতে কোনো মজা ও আনন্দ নেই অথচ বিনা প্রয়োজনেই আমরা আমাদের মাথায় এ গুনাহর বোঝা তুলে নেই।
৭. সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও নীচ ব্যক্তিকে নেতা বানানো হবে।
৮. অনিষ্টের ভয়ে মানুষকে সম্মান করা হবে। কারণ তার সম্মান করা না হলে সে কোনো না কোনোভাবে আমাকে ফাঁসিয়ে দিবে।
৯. ব্যাপকভাবে মদ পান করা হবে।
১০. ব্যাপকভাবে রেশমি কাপড় পরিধান করা হবে।
১১. ঘরে নর্তকী ও গায়িকা রাখা হবে এবং বাদ্যযন্ত্র ও নাচ-গানের উপকরণকে যত্নসহকারে রাখা হয় যখন এ কথা বলেছিলেন, তখন অনেকের মনে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল যে, প্রত্যেক ব্যক্তি কীভাবে ঘরে নর্তকী ও গায়িকা রাখবে? কারণ প্রত্যেক ব্যক্তির এতটুকু আর্থিক সামর্থ্য কোথায় যে, সে নর্তকী ও গায়িকার ব্যয়ভার বহন করবে এবং যখন ইচ্ছা নাচ-গান দেখবে ও শুনবে? কিন্তু আজকাল রেডিও, সিডি-ভিসিডি, টিভি, স্যাটেলাইট টিভি, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ইত্যাদি বিষয়টিকে সহজ করে দিয়েছে। এখন প্রত্যেক ব্যক্তির ঘরেই রেডিও, টেলিভিশন ও ভিসিডি আছে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির পকেটেই মোবাইল ফোন আছে; যখন ইচ্ছা নাচ-গান দেখা ও শোনা যায়। এখন আর বাদ্যযন্ত্র কেনার প্রয়োজন পড়ে না। ব্যস, টিভি অন কর, তা দ্বারাই বাদ্যযন্ত্র, নর্তকী ও গায়িকা রাখার উদ্দেশ্য হাসিল হয়।
১২. এ উম্মতের পরবর্তী লোকেরা পূর্ববর্তী লোকদের উপর অভিসম্পাত করবে।

রাসুল সা.. এ আলামতগুলো বর্ণনা করে বলেন, এ আলামতগুলো যখন মুসলিমসমাজে দেখা দিবে তখন মসিবতের পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে। এ আলামতগুলোর অধিকাংশই আজ আমাদের সমাজে বিদ্যমান। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হেফাজত করুন।
শরাবকে শরবত নামে পান করা হবে
অন্য এক হাদিসে রাসুল সা. বলেন, যখন আমার উম্মত শরাবকে শরবত মনে করে পান করবে…। উদাহরণত, শরাব সম্পর্কে বলবে, এটা তো শরবত; এটা হারাম হওয়ার কী আছে? বর্তমানে এই মর্মে অনেক প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে যে, বর্তমান যুগের শরাব হারাম নয় এবং কুরআন শরিফে শরাব হারাম এ ধরনের কোনো শব্দ নেই। তাই বিয়ার ও ভদকা হারাম নয়। এভাবেই শরাব হালাল করার জন্য বিভিন্নভাবে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা হচ্ছে। রাসুলুল্লাহ সা. চোদ্দশত বছর পূর্বে এরই সংবাদ দিয়ে গেছেন।
.
সুদকে ব্যবসায় নাম দেওয়া হবে

যখন আমার উম্মত সুদকে ব্যবসা বলে হালাল করবে..। যেমন, আজকাল সুদকে মুনাফা ও ব্যবসা নাম দেওয়া হচ্ছে, বলা হচ্ছে, ব্যাংকে যে সুদী লেনদেন হয় তা ব্যবসারই একটি পদ্ধতি। যদি এটি বন্ধ করা হয় তা হলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে যাবে।
ঘুষকে উপহার নাম দেওয়া হবে।

যখন আমার উম্মত ঘুষকে গিফট ও উপহার বলে হালাল করবে…। যেমন, আজকাল ঘুষদাতা আপনাকে গিফট দিলাম বলে ঘুষ দিচ্ছে এবং ঘুষ গ্রহণকারী গিফট বলেই তা গ্রহণ করছে অথচ এটি ঘুষ। যখন আমার উম্মত যাকাতের মালকে ব্যবসার মালরূপে গণ্য করবে তখন উম্মতের উপর ধ্বংস নেমে আসবে। এ চারটি বিষয় আলোচ্য হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখ করেছেন। এগুলো আজ আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হেফাজত করুন।
.
লোকজন গাড়িতে আরোহণ করে মসজিদে আসবে

এক হাদিসে রাসুল সা. বলেন, ফেতনার যুগে লোকেরা ‘মায়াসির’ এর উপর আরোহণ করে আসবে এবং মসজিদের দরজায় এসে নামবে। ‘মায়াসির’ আরবি শব্দ। মূল্যবান রেশমি কাপড়কে ‘মায়াসির’ বলা হয়। সে যুগে আমির-উমারাগণ ঘোড়ার পিঠের গদিয়ো উপর এটি ব্যবহার করত। আগের যুগে এটি কল্পনা করা কঠিন ছিল যে, একজন মুসলমান মূল্যবান রেশমি কাপড়ে নির্মিত গদিয়ো উপর আরোহণ করে কীভাবে মসজিদে আসবে? কিন্তু বর্তমানে নানারকম মটরগাড়ি আবিষ্কৃত হওয়ায় এটি বুঝা আমাদের জন্য সহজ হয়েছে। এখন লোকেরা দামি দামি গাড়িতে আরোহণ করে মসজিদের দরজায় এসে নামে।
.
নারীরা পোশাক পরিহিত থাকবে অথচ মনে হবে বিবস্ত্র

নারীরা পোশাক পরিহিত থাকবে অথচ এরপরও বস্ত্রহীন হবে। আগের যুগে এটি বুঝা অনেক কঠিন ছিল যে, পোশাক পরিহিত থেকেও কীভাবে বস্ত্রহীন হয়? কিন্তু আজকে আমরা এটি ঠিকই দেখছি; মেয়েরা এত পাতলা পোশাক পরিধান করে যে, দেহের অঙ্গগুলো সবই বাহির থেকে দেখা যায় কিংবা এত সংক্ষিপ্ত পোশাক পরিধান করে যে, দেহের অনেক অঙ্গই উন্মুক্ত থাকে কিংবা পোশাক এতটা টাইট পরিধান করে যে, দেহের অঙ্গগুলো ফুঁটে থাকে।
.
মহিলাদের চুল হবে উটের কুঁজের ন্যায়

মহিলাদের চুল হবে উটের কুঁজের ন্যায়। আগের যুগের আলেমগণ এ হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পেরেশান হতেন যে, চুল আবার উটের কুঁজের ন্যায় কীভাবে হয়? কারণ উটের কুঁজ অনেক উঁচু হয়, চুল কীভাবে এত উঁচু হবে? কিন্তু কল্পনাতীত অনেক বিষয়কে আজকের যুগ বাস্তব করে দেখিয়েছে। আজকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মেয়েরা চুলকে ফুঁলিয়ে উঁচু করে বাঁধে।

এই নারীরা অভিশপ্ত

রাসুল সা. এরপর বলেন, এ নারীরা অভিশপ্ত; এদের উপর অভিসম্পাত কর। আল্লহ তাআলা নারীদেরকে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। যখন নারী পর্দাহীন অবস্থায় বাহিরে বের হয় তখন শয়তান তার পিছু নেয় এবং তাকে উকি-ঝুঁকি মেরে দেখে। যখন নারীরা সুগন্ধি ব্যবহার করে পথে-ঘাটে বের হয়, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের উপর অভিসম্পাত হয় এবং ফেরেশতারাও এরূপ নারীদের উপর অভিসম্পাত করে।

পোশাকের মূল উদ্দেশ্য
পোশাকের মূল উদ্দেশ্য হল সতর ঢাকা। কুরআন শরিফে আল¬াহ তাআলা বলেন :
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا
আমি তোমাদেরকে পোশাক দান করেছি যাতে তা তোমাদের লজ্জায় সতর ঢাকে এবং তোমাদের শোভা বর্ধন করে। [সূরা আরাফ, আয়াত : ২৬]।

সুতরাং যে পোশাক সতর ঢাকে না, তা দ্বারা পোশাকের আসল উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না। তাই এরূপ পোশাক পরিধান করা সত্ত্বেও পরিহিত ব্যক্তি থাকে উলঙ্গ। আজকাল অনেক দীনদার, পরহেজগার ও নামাজি ব্যক্তিদের মাঝেও শালীন পোশাকের গুরুত্ব কমে গেছে। পোশাকের দ্বারা দেহ আবৃত হচ্ছে কিনা তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হচ্ছে না আর এর কুপ্রভাব পড়ছে আমাদের সমাজের উপর। তাই পরিবারস্থ মেয়েদেরকে শরিয়তসম্মত পোশাক পরিধান করানোর প্রতি আমরা বিশেষ যত্ন নিব, যাতে পর্দা রক্ষা হয় এবং আল্লাহ ও ফেরেশতাদের অভিসম্পাত থেকে আমরা সকলে বেঁচে যাই।
.
অপরাপর সম্প্রদায় মুসলমানদেরকে গ্রাস করবে

এক হাদিসে হযরত সাওবান রা. বর্ণনা করেন, রাসুল সা. বলেন, একটি সময় আসবে যখন পৃথিবীর অপরাপর জাতি তোমাদেরকে গ্রাস করার জন্য একে অন্যকে আহ্বান জানাবে, খাবারের জন্য দস্তরখানে যেরূপ একে অন্যকে আহ্বান করে। দস্তরখান বিছানো হয়েছে, তাতে খাবার দেওয়া হয়েছে এবং খাওয়ার জন্য একজন লোক বসেছে, ইতোমধ্যে দ্বিতীয় আরেক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হল, এরূপ ক্ষেত্রে সাধারণত দস্তরখানে বসা ব্যক্তি আগন্তুককে বলে, আসো, আমার সাথে খাবারে শরিক হও।
আজকে মুসলমানদের অবস্থা এরূপই; মুসলমানরা দস্তরখানের খাবার। মুসলমানদেরকে গ্রাস করার জন্য দুনিয়ার বড় বড় শক্তিগুলো যুদ্ধের আয়োজন করছে আর অন্যদেরকে আহ্বান করছে, আসো মুসলমানদেরকে গ্রাস করি। যারা গত একশ বছরের ইতিহাস জানেন, তারা দেখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত অমুসলিম জাতিগুলো কীভাবে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করছে। তারা যেন বলছে, মিসর তোমাদের, সিরিয়া আমাদের, আলজেরিয়া তোমাদের, ফিলিস্তিন ওদের, হিন্দুস্তান ওদের, মরক্কো তোমাদের এবং বার্মা আমাদের।

মুসলমানরা হবে খড়কুটোর মতো

রাসুল সা. সাহাবায়ে কেরামের সামনে যখন মুসলমানদের ভবিষৎ দুরবস্থার করা বলেন তখন সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, তখন কি মুসলমানদের সংখ্যা কম হবে? যার কারণে অন্য জাতি-গোষ্ঠির লোকেরা মুসলমানদেরকে গ্রাস করবে এবং অন্যদেরকেও এর জন্য আহ্বান করবে? উত্তরে রাসুল সা. বলেন, না, তখন তোমাদের সংখ্যা অনেক বেশি হবে। আজকে পৃথিবীতে মুসলমানদের সংখ্যা একশো কোটির উপরে। বলতে গেলে জনসংখ্যায় মুসলমানরা পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ। এরপরও কিন্তু বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া খড়কুটার মতো অবস্থা হবে তোমাদের। খড়কুটোর যেরূপ কোনো শক্তি নেই, নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেই, নিজের ইচ্ছা বলে কিছু নেই বরং পানি যেদিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সেদিকে ভেসে যায়; তোমাদের অবস্থাও হবে তেমন।
.
মুসলমানরা হীনবল হয়ে যাবে

এরপর রাসুল সা. বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদের হৃদয় থেকে তোমাদের ভয় তুলে নিবেন এবং তোমরা দুর্বল ও হীনবল হয়ে পড়বে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করেন, দুর্বল ও হীনবল হওয়ার অর্থ কী? সাহাবায়ে কেরাম বুঝতে পারছিলেন না যে, মুসলমান আবার দুর্বল ও হীনবল হয় কিভাবে? উত্তরে রাসুল. বলেন, ‘মুসলমানদের হৃদয়ে দুনিয়ার মহব্বত এবং মৃত্যুর প্রতি ঘৃণা জন্মাবে।’ মৃত্যুর প্রতি ঘৃণা জন্মাবে, এর অর্থ হল আল্লাহ তাআলার সাক্ষাতকে অপছন্দ করবে এবং একটিই ফিকির থাকবে যে, কীভাবে অর্থ উপার্জন হয়, সম্মান ও পদ লাভ হয় এবং খ্যাতি অর্জিত হয়; সেটা হালালভাবে হোক কিংবা হারাম পন্থায় হোক।
.
সাহাবায়ে কেরামের সাহসিকতা

সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুমের সাহসিকতার হাজারো ঘটনা ইতিহাসের পাতায় বিদ্যমান আছে। একবার এক যুদ্ধে একজন সাহাবি একা পিছনে রয়ে যান। শত্সৈরুন্যরা তাকে ঘিরে ফেলে। তিনি একাই তাদের সাথে লড়াই করার অভিপ্রায়ে অগ্রসর হন। ইতোমধ্যে আরো কয়েকজন সাহাবি তাঁর সাহায্যে পৌঁছে যায়। তাঁরা তাকে বলেন, তুমি একা, শত্র“রা সংখ্যায় অনেক; এ মুহূর্তে লড়াই না করে পিছু হটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তিনি বলেন, আমি তোমাদেরকে কসম দিচ্ছি যে, তোমরা আমার ও জান্নাতের মাঝে প্রতিবন্ধক হওয়ার চেষ্টা কর না। শত্রুসৈন্যরা তো আমার জান্নাতে যাওয়ার অসিলা।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যের বরকতে সাহাবায়ে কেরামের হৃদয় থেকে দুনিয়ার মহব্বত বিদূরীত হয়েছিল। তাই মুসলমান হীনবল হতে পারে এটা তারা বুঝতে পারছিলেন না। তাদের ফিকিরে সর্বদাই ছিল আখেরাত। জান্নাত ও জাহান্নাম তারা দেখতে পেতেন। তাই তারা মরতে ভয় পেতেন না। বরং আল্লাহর কাছে পৌঁছার উপায় সন্ধান করে ফিরতেন।

এক সাহাবির শাহাদাতের আগ্রহ
এক সাহাবি যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হলেন। দেখলেন সামনে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যবাহিনী আক্রমণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তাঁর মুখ থেকে হঠাৎ এই পঙ্ক্তিটি বেরিয়ে এলো :
غَدًا نَلْقَى الْأَحِبَّةَ … مُحَمَّدًا وَحِزْبَهُ
বাহ, কি দারুণ দৃশ্য, কাল আমি বন্ধুদের সঙ্গে অর্থাৎ মুহাম্মদ সা. এবং তাঁর সাহাবিদের সঙ্গে দেখা করব।’ [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১২০২৬]
এক সাহাবির বুকে এসে তীর বিদ্ধ হয়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। তা দেখে তিনি স্বগতকণ্ঠে বলে উঠেন,
فُزْتُ وَرَبِّ الكَعْبَةِ
কাবার রবের কসম! আমি সফল হয়ে গেছি। [সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮০১]
তারা ছিলেন ইমান ও বিশ্বাসের মূর্তপ্রতীক। আল্লাহ তাআলার উপর ভরসাই ছিল তাদের একমাত্র পুঁজি। দুনিয়ার ভালোবাসা তাদের হৃদয়-মন থেকে সম্পূর্ণরূপে বিদূরীত হয়েছিল।

ফেতনার যুগের প্রথম করণীয়

ফেতনার যুগে একজন মুসলমান কী কর্মপন্থা অবলম্বন করবে এ সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম নির্দেশ হল :
تَلْزَمُ جَمَاعَةَ الْمُسْلِمِينَ وَإِمَامَهُمْ
বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী ও তাদের ইমামের সাথে জামাতবদ্ধ হয়ে থাকো এবং যারা মুসলিম ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাদেরকে ত্যাগ করো। এক সাহাবি প্রশ্ন করেন, যদি মুসলমানদের বড় দল এবং ইমাম না থাকে তা হলে মানুষ কী করবে? অর্থাৎ যখন মুসলমানদের একক দল থাকবে এবং তাদের এমন কোনো নেতা থাকবে যার দীনদারিতা, আমানতদারিতা এবং তাকওয়ার উপর আস্থা রাখা যাবে তখন তো উক্ত ইমামের আনুগত্য করব। কিন্তু যদি মুসলমানদের একক দল না থাকে কিংবা নির্ভরযোগ্য ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য কোনো ইমাম না থাকে তখন কী করব?
উত্তরে রাসুল সা. বলেন, এরূপ অবস্থায় সকল দল ও পার্টি থেকে আলাদা হয়ে একাকী জীবনযাপন করো এবং নিজ ঘরের চাটাই বনে যাও। আগের যুগে বিছানারূপে চাটাই ব্যবহার করা হত। বর্তমানে তার জায়গায় এসেছে কার্পেট। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার মর্ম হল, ঘরের বিছানা এবং কার্পেট যেরূপ একবার বিছানো হলে বারবার উঠানো হয় না, তদ্রূপ তোমরাও নিজ ঘরে বিছানা ও কার্পেটের মতো পড়ে থাকো এবং বিনা প্রয়োজনে ঘর ছেড়ে বের হয়ো না; ‘একলা চল নীতি’ গ্রহণ করো। [সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬০৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৪৭]।
.
ফেতনার যুগের দ্বিতীয় করণীয়

এক হাদিসে আছে, যখন তোমরা লোকসমাজ থেকে আলাদা হয়ে একাকী জীবনযাপন করবে তখন মুসলমানরা যদি পরস্পরে লড়াই ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং তাদের মাঝে গুম ও হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে, তাহলে এ সব ঘটনা দেখার জন্য ঘর থেকে উঁকিও দিবে না। কারণ যে ব্যক্তি দেখার জন্য ঘর থেকে উঁকি দিবে, ফেতনা তাকেও তাতে জড়িয়ে ফেলবে। তাই এরূপ পরিস্থিতিতে নিজ ঘরে জমে বসে থাকবে।
.
ফেতনার যুগের তৃতীয় করণীয়

অন্য একটি হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
্রسَتَكُونُ فِتَنٌ القَاعِدُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ القَائِمِ وَالقَائِمُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ المَاشِي
ফেতনার যুগে দাঁড়ানো ব্যক্তি উত্তম হবে চলন্ত ব্যক্তির চেয়ে আর দাঁড়ানো ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে উপবিষ্ট ব্যক্তি। [সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬০১; সহিহ মুসলিম, সুনানুত তিরমিজি]

হাদিসের অর্থ হল, ফেতনামূলক কর্মকাণ্ডে কোনোভাবেই অংশগ্রহণ করবে না। ফেতনার বিষয়ে আগ্রহ রাখা এবং তা দেখার উদ্দেশ্যে গমন করাও বিপদজনক হবে। তাই স্থির দাঁড়িয়ে থাকাই সমীচীন হবে, তারচেয়েও ভালো হবে দাঁড়িয়ে না থেকে বসে যাওয়া, তারচেয়েও ভালো হবে শুয়ে পড়া। এককথায় এরূপ পরিস্থিতিতে ঘরে বসে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনোপকরণ সংগ্রহের জন্য ফিকির কর এবং ঘর থেকে বের হয়ে দলীয় বা নির্দলীয় কোনো প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ কর না।

ফেতনার যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ
অন্য এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, একটা সময় আসবে যখন মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হবে তার বকরির পাল। সে তা নিয়ে শহুরে জীবন ত্যাগ করে পাহাড়ের চূড়ায় চলে যাবে এবং বকরি পালের উপর নির্ভর করে জীবনযাপন করবে। এরূপ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি নিরাপদ হবে। কারণ শহরগুলোতে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ নানাবিধ ফেতনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

ফেতনার যুগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ
উপরিউক্ত হাদিসগুলোতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কথাটি বিশেষভাবে বলতে চেয়েছেন তা হল, ফেতনার যুগ দলীয় ও সমষ্টিগত কাজের জন্য অনুকূল হবে না। কারণ সব দলই হবে অসৎ ও দুর্নীতিবাজ। কোনো দলের উপরেই আস্থা রাখা যাবে না। কোনো দলের দাবি সঠিক তা বুঝার উপায় থাকবে না। এ সময় নিজেকে সব ধরনের ফেতনা থেকে বাঁচিয়ে আল্লা তাআলার আনুগত্যে নিয়োজিত রেখে ইমান নিয়ে কবরে যাওয়াই হবে প্রধান কাজ। সেযুগে ফেতনা থেকে বাঁচার এটিই একমাত্র রাস্তা। বক্তব্যের শুরুতে আমি যে আয়াতটি তেলাওয়াত করেছি, তার পূর্বাপর বক্তব্য থেকেও এ কথাই বুঝা যায়। আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, যদি তোমরা হেদায়েতের উপর থাক তা হলে কেউ গোমরাহ হয়ে গেলে তাদের গোমরাহি তোমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হবে না।
রেওয়ায়েতে আছে যে, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, মানুষ শুধু নিজের ফিকির করবে, অন্য কারো ফিকির করবে না; যদি কোনো ব্যক্তি ভুল পথে চলে তা হলে তাকে চলতে দিবে এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে না। অথচ আমরা জানি, সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা এবং অন্যদেরকে নেক আমলের দিকে দাওয়াত দেওয়া ও তার কাছে দীন পৌঁছানো আমাদের কর্তব্য। তা হলে উপর্যু ক্কতথা দুটি সাংঘর্ষিক নয়?

ফেতনার যুগের চার আলামত

উত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করার যে বিধান শরিয়তে আছে তা যথা স্থানে সঠিক। তবে এমন সময় আসবে যখন নিজের সংশোধনের চিন্তা করাই মানুষের দায়িত্ব হবে। এটি হল ঐ সময় যখন মুসলিমসমাজে চারটি আলামত প্রকাশ পাবে। তা হল,
১. ঐ যুগে মানুষ ধন-সম্পদ উপার্জনের পিছনে লেগে থাকবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটিই চিন্তা হবে, আরো বেশি পয়সা কীভাবে আসবে? মাল-সম্পদ উপার্জনের উদ্দেশ্যেই সকল কাজ করা হবে।
২. মানুষ সর্বদা স্বার্থ উদ্ধার এবং প্রবৃত্তি পূরণে ব্যস্ত থাকবে। কাজটি হালাল না হারাম, এটি জান্নাতের পথ না জাহান্নামের পথ, এ পথে আল্লাহর সন্তুষ্টি আছে না অসন্তুষ্টি আছে, এগুলো চিন্তা করার মতো মন-মানসিকতা এবং অবসর থাকবে না।
৩. লোকেরা দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দিবে অর্থাৎ আখেরাতের বিলকুল চিন্তা করবে না। দুনিয়া নিয়ে এত বেশি চিন্তা করবে যে, একদিন মরতে হবে, অন্ধকার কবরে থাকতে হবে, আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে– এ সব বিষয় বুঝানোর পর উত্তরে সে বলবে, কি করব, যুগটাই এরকম। আমাদেরকে তো সবার সাথে মিলেমিশে দুনিয়াতে থাকতে হবে। সব নসীহত ও উপদেশকে এক কথায় উড়িয়ে দিবে।
৪. প্রত্যেক মানুষ নিজের বুঝ-বুদ্ধি ও ভাবনাকে সঠিক জ্ঞান করবে এবং তা নিয়ে আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত হবে। অন্যের কথা শোনার জন্য একবারেই প্রস্তুত থাকবে না। নিজের মতামতকেই সঠিক মনে করবে এবং অন্যদের কথাকে ভুল মনে করবে। আজকাল এটাই দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি মানুষ দীনি বিষয়েও নিজস্ব মতামত পোষণ করে এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে হালাল ও হারামের বিচার বিশ্লেষণ করে। অথচ সারাজীবন কখনও কুরআন ও হাদিস বুঝার জন্য একদিন সময়ও ব্যয় করেনি। কিন্তু যখনি তার সামনে কোনো শরিয়তের হুকুম বর্ণনা করা হয় তখন বলে উঠে, আমার মতে এটি সঠিক নয়। এরপর নিজের মতামত তুলে ধরে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে বলেছেন, প্রত্যেকে নিজস্ব মত নিয়ে দম্ভ করবে।
মোটকথা, যে যুগে উর্যুউক্ত চারটি আলামত প্রকাশ পাবে অর্থাৎ মানুষ মালের পেছনে ছুটবে এবং নফসানি খাহেশাতের পিছনে পড়বে, দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দিবে এবং প্রায় প্রতিটি মানুষ নিজস্ব মত ও বুঝ নিয়ে দম্ভ করবে, তখন নিজেকে বাঁচানোর চিন্তা করো এবং সাধারণ মানুষদের চিন্তা বাদ দাও। কারণ যদি সাধারণ লোকদের ফিকিরের জন্য বাইরে বের হও তা হলে ফেতনা তোমাকে নিজের দিকে টেনে নিবে। তাই শুধু নিজের ফিকির করো এবং নিজের সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় মেহনত করো। ঘর থেকে বের হয়ো না, ঘরের দরজা বন্ধ করে ভিতরে বসে থাকো। কোনো ঘটনা দেখার জন্যও ঘর থেকে বের হয়ো না, এমনকি জানালা দিয়ে উঁকিও দিয়ো না।

মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের কর্মপন্থা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতেকালের পর সাহাবিদের যুগ শুরু হয়। খেলাফতে রাশেদার শেষযুগে হযরত আলি ও হযরত মুয়াবিয়া রা. এর মাঝে মারাত্মক মতপার্থক্য সৃষ্টি হয় এবং তা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। হযরত আলি রা. এবং হযরত আয়শা রা. এর মাঝেও মতবিরোধ দেখা দেয় এবং যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়। পারস্পরিক মতবিরোধ দেখা দিলে তখনকার কর্মপন্থা কি হবে, আগত উম্মতের জন্য আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এ বিষয়ে নির্দেশনা রেখেছেন। সেযুগের সাহাবি ও তাবেয়িদের মধ্যে যারা মনে করতেন হযরত আলি রা. হকের উপরে আছেন, তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদিসের উপরে আমল করেছেন :
تَلْزَمُ جَمَاعَةَ الْمُسْلِمِينَ وَإِمَامَهُمْ
বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী ও তাদের ইমামের সাথে জামাতবদ্ধ হয়ে থাক। যেহেতু হযরত আলি রা. তখন বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইমাম ছিলেন তাই অধিকাংশ সাহাবি ও তাবেয়ি হযরত আলি রা. কে সমর্থন দিয়েছিলেন আর যে সকল সাহাবি ও তাবেয়ি মনে করতেন হযরত মুয়াবিয়া রা. হকের উপর আছেন, তারা হযরত মুয়াবিয়া রা. এর পক্ষে অবস্থান নেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তৃতীয় আরেকটি দল ছিল যারা বলতেন, আমরা বুঝতে পারছি না কে হকের উপরে আছে, তাই তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় নির্দেশ অনুসারে নিরপেক্ষ থাকেন; কোনো পক্ষ অবলম্বন করেননি।

হযরত ইবনে উমর রা. এর কর্মপন্থা

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর ছেলে ছিলেন। তিনি অনেক উঁচু স্তরের সাহাবি ও ফকিহ ছিলেন। তিনি তখন উভয় পক্ষ থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, বাইরে হক ও বাতিলের লড়াই চলছে আর আপনি ঘরে বসে আছেন? হযরত আলি এবং হযরত মুয়াবিয়া রা. এর মাঝে যে লড়াই চলছে, হযরত আলি রা. এর অবস্থান হকের পক্ষে, আপনার তাঁর পক্ষ অবলম্বন করা উচিত। উত্তরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, আমি তো সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি , ‘যখন মুসলমানদের দু’পক্ষ পরস্পর লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় এবং হক ও বাতিল সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য করা না যায়, তখন নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে নিভৃতে জীবনযাপন করো এবং ধনুক ও হাতিয়ার ভেঙ্গে ফেল।’
যেহেতু আমি হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করতে পারছি না তাই হাতিয়ার ত্যাগ করে নিজ ঘরে নিভৃতে জীবনযাপন করছি। লোকটি বলল, আপনি ভুল করছেন। কারণ কুরআন শরিফে ইরশাদ হয়েছে,
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ
ফেতনা নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত তোমরা লড়াই করো।’ [সুরা বাকারা, আয়াত : ৯৩]।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. লোকটির উত্তরে বড় সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেন :
وَقَاتلنا حَتَّىٰ لَمْ تَكُنْ فِتْنَةٌ وقاتلتم حتي كانت الفتنة
আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে লড়াই করেছি এবং আল্লাহ তাআলা ফেতনাকে নির্মূল করেছেন আর এখন তোমরা লড়াই করছ, এতে ফেতনা নির্মূল হচ্ছে না বরং তোমরা ফেতনা আরো উসকে দিচ্ছ। তাই আমি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার উপর আমল করে নিভৃত জীবনযাপন করছি।
.
শান্তি ও ফেতনার সময় আমাদের কর্মপন্থা কী হবে?

এ সম্পর্কে একজন মুহাদ্দিসের একটি উক্তি আমার নজরে পড়ে। আমি কথাটি পড়ে বিস্মিত হই। তিনি বলেন :
اقتدوا بعمر رضي الله عنه في الامن وبابنه في الفتنة
শান্তির সময় তোমরা হযরত উমরকে অনুসরণ করো এবং ফেতনার সময় তাঁর ছেলেকে অনুসরণ করো। অর্থাৎ শান্তির সময় হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর কর্মপন্থা কী ছিল তা খুঁজে দেখো এবং তার উপর আমল করো এবং ফেতনার সময় তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর কর্মপন্থা অবলম্বন করো। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ফেতনার সময় অস্ত্র ত্যাগ করে নিজ ঘরে নিভৃতে জীবনযাপন করেন।
.
মতবিরোধ সত্ত্বেও পারস্পরিক সুসম্পর্ক

মতবিরোধ সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্পর্ক কিরূপ হবে, আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরামের জীবনেই তা দেখিয়েছেন। যে সকল সাহাবি হযরত মুয়াবিয়া রা. হকের উপর আছেন বলে মনে করতেন তারা হযরত মুয়াবিয়া রা. এর পক্ষ অবলম্বন করেছেন আর যারা হযরত আলি রা. হকের উপর আছেন বলে মনে করতেন তারা হযরত আলি রা. এর পক্ষ অবলম্বন করেছেন। কোনো এক পক্ষ অবলম্বন করা সত্ত্বেও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এত সহানুভূতিপূর্ণ ছিল, পৃথিবীর ইতিহাস যা পূর্বে কখনও দেখেনি। উভয় পক্ষ নিজ নেতৃত্বের অনুকূলে লড়াই করছিল কিন্তু হযরত আলি রা. এর বাহিনীর কেউ ইনতেকাল করলে হযরত মুয়াবিয়া রা. এর লোকেরা তার জানাযায় শরিক হত। হযরত মুয়াবিয়া রা. এর বাহিনীর কেউ ইনতেকাল করলে হযরত আলি রা. এর লোকেরা তার জানাযায় শরিক হত। এর কারণ ছিল, তাদের লড়াই কোনো ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য ছিল না বরং হযরত আলি রা. আল্লাহ তাআলার হুকুমের মর্ম একরকম বুঝেছিলেন এবং তার উপর আমল করছিলেন আর হযরত মুয়াবিয়া রা. অন্যরকম বুঝেছিলেন এবং তদনুযায়ী আমল করছিলেন। উভয়েরই লক্ষ্য ছিল আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন করা।
.
হযরত আবু হোরায়রা রা. এর কর্মপন্থা

হযরত আবু হুরায়রা রা. শিক্ষক ছিলেন। আমার পিতা বলতেন, ইনি মৌলবিদের মত সাহাবি ছিলেন; সর্বদা পড়া ও পড়ানোর কাজেই ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর কর্মপন্থা ছিল, তিনি উভয় পক্ষের লোকদের কাছেই যেতেন; বিশেষ কোনো পক্ষাবলম্বন করেননি। নামাজের সময় হলে হযরত আলি রা. এর সেনাছাউনিতে এসে আলি রা. এর পিছনে নামাজ পড়তেন। খাবারের সময় হলে হযরত মুয়াবিয়া রা. এর সেনাছাউনিতে গিয়ে তাদের সাথে খাবারে শরিক হতেন। একবার জনৈক ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করল, আপনি এরূপ কেন করেন? উত্তরে তিনি বলেন, নামাজ ওখানে ভালো হয় আর খাবার এখানে ভালো হয়।
.
রোম সম্রাটকে হযরত মুয়াবিয়া রা. এর জবাব

সাহাবিদের এ দু’পক্ষের লড়াই চলাকালে একদিন রোম সম্রাটের একজন দূত হযরত মুয়াবিয়া রা. এর কাছে আসে। রোম সম্রাট হযরত মুয়াবিয়াকে পত্রমারফত লিখেন, আমি শুনেছি, আপনার ভাই হযরত আলি রা. আপনার প্রতি জুলুম করছেন এবং হযরত উসমান রা. এর হত্যাকারীদের বিচার করছেন না। আপনি চাইলে আপনার সাহায্যে আমি একটি বড় বাহিনী প্রেরণ করতে পারি, এতে আপনি হযরত আলিকে সহজেই পরাস্ত করতে পারবেন। উত্তরে হযরত মুয়াবিয়া রা. তাৎক্ষণিক লিখে পাঠান, ‘এই খ্রিস্টান, তুমি ভাবছ আমাদের পারস্পরিক মতবিরোধের সুযোগ নিয়ে তুমি হযরত আলি রা. এর উপর হামলা করবে। মনে রেখো! যদি তুমি হযরত আলি রা. এর প্রতি চোখ তুলে তাকানোর দুঃসাহস করো তা হলে হযরত আলি রা. এর বাহিনীর যে সৈন্যকে তুমি সর্বাগ্রে দেখবে, যে তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবে, সে হল মুয়াবিয়া।’ [তাজুল উরুস, ৭/২০৮]।
.
সকল সাহাবি আমাদের কাছে সম্মানিত ও মর্যাদাবান

আজকাল অনেক লোক সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করে অথচ সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা বুঝা সহজ কাজ নয়। আজ তাদের পারস্পরিক মতবিরোধ ও লড়াইকে আমরা আমাদের মতবিরোধ ও লড়াইয়ের মত মনে করছি। অথচ প্রকৃত সত্য হল, আল্লাহ তাআলা তাদের পারস্পরিক লড়াই ও মতবিরোধকে উপলক্ষ করে পুরা উম্মতকে দিশা দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে মুসলমানদের মধ্যে কখনও এরূপ অবস্থা হলে কি কর্মপন্থা অবলম্বন করতে হবে। হযরত আলি রা., হযরত মুয়াবিয়া রা., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হযরত আবু হুরায়রা রা., যে সাহাবিই হোক না কেন, প্রত্যেকের জীবনেই আমাদের জন্য আদর্শ আছে। তাই যারা সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক মতবিরোধকে কেন্দ্র করে তাদের সমালোচনা করে তাদের ব্যাপারে আমাদের সর্তক থাকতে হবে।
.
হযরত মুয়াবিয়া রা. এর তাকওয়া

হযরত মুয়াবিয়া রা. নিজের ছেলে ইয়াজিদকে তাঁর পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিলেন, এ জন্য অনেক লোক তাঁর সমালোচনা করে। অথচ ইতিহাসের কিতাবে লেখা আছে, একবার জুমার নামাজের খুতবায় মিম্বরের উপরে দাঁড়িয়ে তিনি দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ, আমি যে আমার ছেলে ইয়াজিদকে আমার পরবর্তী খলিফারূপে মনোনীত করেছি। আপনি আমার নিয়ত সম্পর্কে অবগত আছেন। তাকে মনোনীত করার সময় মুসলমানদের কল্যাণচিন্তা ছাড়া আমার মাথায় কিছুই ছিল না। যদি আমার মনে এতদভিন্ন অন্য কোনো চিন্তা থাকে তা হলে আমি দোয়া করছি , হে আল্লাহ! আমার এ মনোনয়ন কার্যকর হওয়ার পূর্বেই আপনি তাকে দুনিয়া থেকে তুলে নিন। [তারিখুল খোলাফা]।

দেখুন, হযরত মুয়াবিয়া রা. জুমার খুতবার মতো দোয়া কবুলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যে দোয়া করেছেন কোনো পিতা নিজ সন্তানের জন্য এরূপ দোয়া করতে পারে না। এ থেকে বুঝা যায়, হযরত মুয়াবিয়া রা. যা কিছু করেছেন তা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে করেছেন। মানুষের ভুল হতে পারে, নবীগণ ছাড়া যে-কোনো মানুষের ভুল হতে পারে, সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে কিন্তু তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা আল্লাহর জন্য এখলাসের সাথেই নিয়েছিলেন।
.
একলা চলার নীতি গ্রহণ করো

মোটকথা, হযরত সাহাবায়ে কেরাম রা. ফেতনার যুগের সকল হাদিসের উপর আমল করে ফেতনার যুগে আমাদের করণীয় কি, তার নমুনা রেখে গিয়েছেন। হযরত আলি ও হযরত মুয়াবিয়া রা. এর মাঝে যখন লড়াই হয় তখনও সাহাবায়ে কেরামের একটি বড় দল নিরপেক্ষ ছিলেন। এদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর মতো প্রখ্যাত সাহাবিও ছিলেন। সে যুগেও যখন হক ও বাতিল কোনটি তা নিশ্চিতভাবে চেনা যায়নি, নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করা ছাড়া এরূপ ক্ষেত্রে অন্য কোনো পথও ছিল না।
মূলত এটা আল্লাহ তাআলারই বিস্ময়কর ফয়সালা ছিল যে, সাহাবায়ে কেরামের একটি বড় দল সেই যুগে নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিলেন। তাদের দ্বারা আল্লাহ তাআলা দীনের অনেক বড় খেদমত নিয়েছেন। যদি সকল সাহাবি যুদ্ধে শামিল হত, হয়ত অনেক সাহাবি শহিদ হয়ে যেতেন এবং তারা দীনের যে আজিমুশ্বান খেদমত আনজাম দিয়েছিলেন তা তারা দিতে পারতেন না। যে সাহাবিগণ নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন তারাই হাদিস সংকলনের সূচনা করেছিলেন এবং তাদের এ পদক্ষেপের কারণেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত দীন এবং তাঁর হাদিসসমূহ বিধিবদ্ধরূপে সংকলিত হয়।
.
নিজের সংশোধনের চিন্তা করুন
যাহোক, ফেতনার যুগের নির্দেশ হল ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাক এবং আল্লাহ আল্লাহ করো আর নিজের ইসলাহের ফিকির কর যে, আমি কীভাবে গুনাহ থেকে বেঁচে যেতে পারি, আল্লাহর অনুগত এবং বাধ্যগত বান্দা হতে পারি এবং আমি আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদেরকে আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে দীনের উপর রেখে যেতে পারি। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। নানাপ্রকার মানুষ নিয়েই সমাজ গড়ে উঠে। যদি একজন ব্যক্তির ইসলাহ হয় তা হলে কমপক্ষে একজন খারাপ লোক থেকে সমাজ মুক্ত হল এবং তার দেখাদেখি আরো লোক যদি ভালো হয় এভাবে একজন-দুজন করেই একসময় সমাজ খারাপ লোক থেকে মুক্ত হবে।

নিজের দোষ দেখুন
বর্তমানে আমরা যে যুগে বাস করছি, এটি মারাত্মক ফেতনার যুগ। রাসুল সা. চোদ্দশত বছর পূর্বে এ যুগের মুসলমানদের জন্য বলে গিয়েছেন যে, কোনো দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, ঘরেই নিভৃতে জীবনযাপন করো। কি ঘটেছে তা জানার জন্য কিংবা কৌতূহল মেটানোর জন্য ঘরের বাইরে যেয়ো না, নিজের ইসলাহের ফিকির কর। দেখ, নিজের মধ্যে কি কি দোষ আছে, সমাজে যে ফেতনা ছড়িয়ে পড়েছে, হতে পারে তা আমার গুনাহরই ফল। প্রতিটি মানুষের এভাবেই চিন্তা করা উচিত যে, যা কিছু হচ্ছে তা আমার গুনাহর কারণে হচ্ছে। একবার হযরত জুননুন মিগরি. রহ. এর কাছে কিছু লোক দুর্ভিক্ষ ও অভাবের অভিযোগ নিয়ে গেল। তিনি তাদের বলেন, এ সব কিছু আমার গুনাহর কারণে হচ্ছে, আমি এখান থেকে চলে গেলে হয়ত আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর রহমত নাযিল করবেন।
পক্ষান্তরে আজকে আমাদের অবস্থা হল, আমরা শুধু অন্যদের দোষ দেখি; অমুকের মাঝে এই এই দোষ, অমুকের এই এই সমস্যা, এর কারণে আজকে সমাজে অশান্তি। নিজের দোষ দেখা লোকের সংখ্যা সমাজে আজ পাওয়া কঠিন। তাই এখনকার কাজ হল, অন্যদের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের সংশোধনের ফিকির কর।

গুনাহ থেকে বাঁচুন
নিজের সংশোধনের জন্য সর্বপ্রথম পদক্ষেপ হবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যেসব গুনাহ হয় সেগুলো একটি একটি করে ছাড়ার ফিকির করা। প্রতিদিন আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়ে বিনীতভাবে তাওবা ও ইসতেগফার করো। আল্লাহর কাছে দোয়া কর যে, হে আল্লাহ, এটা ফেতনার যুগ। আমাকে, আমার পরিবারকে এবং আমার ছেলেমেয়েদেরকে নিজ অনুগ্রহে এ ফেতনা থেকে হেফাজত করুন।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الفِتَنِ، مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
“হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল ফেতনা থেকে পরিত্রাণ চাই।” [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৭৭৮]

দোয়া করার সঙ্গে সঙ্গে গীবত থেকে, চোখের গুনাহ থেকে, অশ্লীলতা ও উলঙ্গপনার গুনাহ থেকে, অন্যদের মনে কষ্ট দেওয়ার গুনাহ থেকে, সুদ ও ঘুষের গুনাহ থেকে নিজেকে যথাসাধ্য বাঁচানো চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাকে ও সকলকে এসব কথার উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here