দক্ষিণ ভারতের রাজ্য কর্ণাটকের সরকার সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যসূচি থেকে টিপু সুলতান ও তার বাবা হায়দার আলি সংক্রান্ত অধ্যায়টি বাদ দিয়েছে। তারা বলছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের জন্য স্কুল বন্ধ, তাই প্রতিটা শ্রেণির পাঠ্যসূচিই কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেজন্যই টিপু সুলতানের অধ্যায় যেমন বাদ পড়েছে, তেমনই বাদ পড়েছে শিবাজী, ইসলাম ও খৃষ্টান ধর্ম সম্বন্ধীয় কয়েকটি অধ্যায় এবং ভারতের সংবিধানের অধ্যায়ও।

ওই রাজ্যের বিজেপি শাসিত সরকার এর আগেও পরিকল্পনা করেছিল টিপু সুলতানের বিষয়টি স্কুলের পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দিতে।

কর্ণাটকের সরকার বলছে, প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসের সিলেবাসই অন্তত ৩০ শতাংশ কমানো প্রয়োজন। সংক্ষেপিত সিলেবাস স্কুল শিক্ষা দপ্তরের ওয়েবসাইটে দেয়ার পরেই জানা যায় যে সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যক্রম থেকে বাদ পড়েছে মহীশুরের শাসক টিপু সুলতান এবং তার বাবা হায়দার আলি সংক্রান্ত অধ্যায়টি।

যদিও সরকার যুক্তি দিচ্ছে, ষষ্ঠ এবং দশম শ্রেণিগুলিতে টিপু সুলতানের বিষয়ে পড়ানো বন্ধ হচ্ছে না, তবে টিপু সুলতানকে নিয়ে গবেষণা করেছেন, মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান যোসেফ বলছিলেন, করোনা সংক্রমণকে সামনে রেখে আসলে যেসব বিষয় সরকারের পছন্দ নয়, সেগুলিকেই বাদ দেয়া হয়েছে।

মি. যোসেফের কথায়, “করোনা সংক্রমণের কারণে স্কুলের পাঠ্যক্রম কিছুটা কমাতে হবে বলা হচ্ছে। এটা তাদের কাছে একটা সুযোগ এনে দিয়েছে – যেসব বিষয়গুলি তাদের অপছন্দের, সেগুলো বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে যেমন হায়দার আলি, টিপু সুলতান আছেন, তেমনই ভারতের সংবিধানের বিষয়ও বাদ পড়েছে।”

তিনি বলেন, বাদ দেয়া প্রতিটা বিষয়ই কর্ণাটক এবং ভারতের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

“স্বাধীনতার পর থেকেই স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস পাঠ্যক্রমে একটা সুষমতা ছিল। কিন্তু যখনই দলীয় চিন্তাভাবনা অনুযায়ী কিছু বিষয় বাদ দেওয়া হতে থাকবে, তখন তো ইতিহাস অধ্যয়নের বড় ক্ষতি করা হবে,” বলছিলেন অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান যোসেফ।

কর্ণাটকের বিজেপি শাসিত সরকার এর আগেও টিপু সুলতানের বিষয়টি স্কুলের পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল।

কংগ্রেস সরকারের আমলে শুরু হওয়া টিপু জয়ন্তী পালনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদরা বলে থাকেন যে টিপু সুলতানকে ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইয়ের জন্য মনে রাখা হয়, কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন একজন অত্যাচারী শাসক।

কোডাগু জেলায় শত শত হিন্দুকে তিনি হত্যা করিয়েছিলেন এবং জোর করে ধর্মান্তরিত করেছিলেন বলেও তারা মনে করেন।

টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের বিক্ষোভ।

ছবির ক্যাপশান,
টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের বিক্ষোভ।

কিছু হত্যা এবং ধর্মান্তরকরণের ঘটনা ওই সময়ে হলেও তার জন্য টিপু সুলতান কোনওমতেই দায়ী ছিলেন না বলে মনে করেন স্বাধীন চিন্তাশীল ইতিহাসবীদেরা।

তারা বলে থাকেন, টিপু সুলতান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যেভাবে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাতেই বিব্রত হয়ে ব্রিটিশরা টিপু সুলতানকে অত্যাচারী শাসক বলে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিলেন। সেই ধারাই এখন হিন্দুত্ববাদীদের গলায় শোনা যাচ্ছে বলে মনে করেন মি. যোসেফের মতো ইতিহাসবিদরা।

এর আগে যখন ইতিহাস বই থেকে টিপু সুলতানকে বাদ দেয়ার প্রসঙ্গ এসেছিল, সেই সময়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি করা হয়, যার প্রধান ছিলেন হাম্পি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক টি. আর. চন্দ্রশেখর।

তিনি বলছিলেন, “আমরা সরকারকে স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছিলাম যে টিপু সুলতানের ইতিহাস পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেয়া যাবে না। কিন্তু এবারে করোনার জন্য সিলেবাসে যে কাটছাঁট করা হয়েছে তার আগে সরকার আমাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করে নি।

“সিদ্ধান্ত নেয়ার পরে বুধবার শিক্ষা দপ্তর থেকে ফোন করে বলা হয় যে তারা সংক্ষেপিত সিলেবাস আমাদের পাঠাবে। কিন্তু এখন সেটা পাঠিয়ে কী লাভ – সিদ্ধান্ত তো তারা নিয়েই নিয়েছে।” সূত্র : বিবিসি

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here