নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় তিনবার গুলি লেগেছিল শেখ হাসান রুবেলের শরীরে।

ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে ওই প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলার এক বছর পূর্ণ হয়েছে আজ শুক্রবার। তখন জুমার নামাজ চলছিল। আল নূর ও লিনউড মসজিদে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ৫১ মুসল্লিকে সেদিন হত্যা করা হয়।

রুবেল বলেন, আমার চোখের সামনে… আমি টের পাচ্ছিলাম, একটা গুলি ঢুকল, দুইটা গুলি, তার পরেরটা ঢুকল এই পেটে। মনে হচ্ছিল– এখন, এইখানে আমার মৃত্যু হবে।

বাংলাদেশের গাজীপুরের ছেলে রুবেল বলেন, শুক্রবার তো অফিস খোলা, আর আমরা দুজনেই চাকরি করি। আমার স্ত্রীর অফিস শেষ হবে রাত ৮টায়। মেয়েকে ডে কেয়ার থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আমার।

‘গুলি খাওয়ার পর মনে হচ্ছিল, হায় খোদা, আমি এখানে পড়ে আছি, মরে যাচ্ছি, আমার মেয়েটার কী হবে, ও বাসায় ফিরবে কীভাবে!’

স্ত্রী আফসানা আনজুমান আর দুই মেয়েকে নিয়ে রুবেল ক্রাইস্টচার্চে থাকেন ২০১৫ সাল থেকে। তিনি বলেন, আল-নূর মসজিদে সেদিন যখন গুলি শুরু হলো, তখনও তিনি স্ত্রী-সন্তানের কথাই শুধু ভাবছিলেন।

৩৫ বছর বয়সী রুবেল পেশায় একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট। প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই ঘটনা তার শরীর আর মনে রেখে গেছে স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন।

তাকে এখন লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হয়। গুলিতে কোমরের হাড়ে যে ক্ষতি হয়েছে, তা ভালো হয়নি পুরোপুরি। তবে নারকীয় সেই হত্যাযজ্ঞ তার মনে যে ছাপ ফেলে গেছে, সেই ক্ষত আরও অনেক বড়।

তিনি বলেন, এখন আমার কেবল মনে হয়, এই বুঝি আবার কিছু ঘটল…। হয়তো স্ত্রীকে নিয়ে গাড়িতে উঠছি, তখনও আমার মনে হয়, এখনই হয়তো কোনো অ্যাক্সিডেন্ট…।

হামলার দায়ে ব্রেনটন ট্যারেন্ট নামের এক অস্ট্রেলীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে ৯২টি অভিযোগ আনা হয়েছে। সে দোষ স্বীকার করে কোনো স্বীকারোক্তি দেয়নি। আগামী জুনে বিচারের মুখোমুখি হবে ওই অস্ট্রেলীয় সন্ত্রাসী।

রুবেল বলেন, আমি জানি না, কখনও তাকে মন থেকে ক্ষমা করতে পারব কিনা।

গত সপ্তাহেও আল নূর মসজিদে নতুন করে হামলার হুমকি এলে শুক্রবার মসজিদটি ঘিরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মসজিদে একটি জায়নামাজ দান করতে এসেছিলেন অ্যাডেলে ক্যারোল ও তার স্বামী ডেস। একটি ঘড়িও উপহার দেন তারা, যাতে নামাজের সময়সূচি লেখা।

ক্যারোল বললেন, আমাদের কিছু দান করা উচিত বলে মনে হয়েছে। মুসলমান ও আরব বন্ধুরা বিদেশে বসবাস করেন। আমরা সবাই এক– কোন ধর্ম কিংবা বর্ণ আমরা, তা দেখার বিষয় নয়। আমরা কেবল মনে করি, আমাদের ভূমিতে এমন কিছু ঘটা উচিত নয়।

এই নগর কেন্দ্রে নামাজে অংশ নিতে নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন স্থান থেকে মুসল্লিরা আসেন। প্রত্যাশার চেয়ে জমায়েত কম হয়েছে। করোনাভাইরাস আতঙ্কের কারণে মুসল্লিরা কম এসেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

সেদিন বন্দুকধারী সন্ত্রাসীকে মুখোমুখি রুখে দেয়ার চেষ্টা করেন আবদুল আজিজ। বললেন, একটি বছর চলে গেছে। কিন্তু আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, ঘটনাটা গতকালের।

তাজ মোহাম্মদ কামরানের পায়ে গুলি লেগেছিল। তার বন্ধুও নিহত হন। ‘এটিকে একটি কঠিন বছর’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাজ বলেন, তবে সব কিছু ছাড়িয়ে আজ নিজেকে খুব শক্তিশালী মনে হচ্ছে।

শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্দা আরডান বলেন, ওই হামলার পর তার দেশ মৌলিকভাবে বদলে গেছে।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here