ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে হাজী শরীয়তুল্লাহ্ ও তাঁর পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। হাজী শরিয়তুল্লাহ্ পূর্ববঙ্গের মাদারীপুর এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে তিনি ও তাঁর পরিবার ছিল উচ্চশিক্ষিত এবং ধার্মিক। তিনি হযরত সৈয়দ আহমাদ’এর ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮২২ সালে তাঁর সাথে যোগাযোগ করেন। সৈয়দ আহমাদও বঙ্গদেশের জন্য এই রকম রত্নের সন্ধানে ছিলেন। মাওলানা শরীয়তুল্লাহ্ ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াই ও তাদের মদতপুষ্ট জমিদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই অভিন্ন মনে করে শোষিত, অত্যাচারিত কৃষক, তাঁতি, তিলি প্রভৃতি অনুন্নত ও দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যে আন্দোলন পরিচালনা করেন।

তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের পাশাপাশি ধর্মীয় সংস্কারের কাজও আঞ্জাম দিয়েছেন। ওই সময় হিন্দু জমিদারগণ মুসলমান কৃষকদের নিকট কালীপুজা, দূর্গাপুজা ইত্যাদীতে কর আদায় করত এবং ঈদ-উল-আযহা’য় কুরবানী নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। শরীয়তুল্লাহ্ সাহেব কুরবানীর ব্যাপারে উৎসাহ্ প্রদান করেন। তিনি নিজে হজ্ব করেন এবং পুত্রদেরও পাঠান। ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দে মাওলানা শরিয়তুল্লাহ্ ইন্তেকাল করেন।

হাজী শরিয়তুল্লাহ্’র বিদায়ের কয়েক বছর আগে তাঁর পুত্র মাওলানা আলাউদ্দিন স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি সংগ্রামের ধারা বদলে দেন। হিন্দু-মুসলমান দরিদ্র শ্রেণীর কাছে তিনিই প্রথম সাম্যবাদ প্রচার করেন। তিনি বলেন, জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকতে হবে। ইসলাম ধর্মানুযায়ী যদি অন্য ধর্মের উপর অত্যাচার হয় তাহলেও আমাদের উচিৎ তাদের পাশে দাড়িয়ে সাহায্য করা। তিনি শাসনতন্ত্র কায়েম করেন। তাঁর বাহিনী তলোয়ার, সড়কি, তীর ধনুক প্রভৃতি অস্ত্রে সজ্জিত হয়। সর্বপ্রথম তিনি পুরোপুরিভাবে বিপ্লবের ডাক দেন।

১৮৪১ সালে আলাউদ্দিন সাহেব কানাইপুরের সিকদার ও ফরিদপুরের জয়নারায়ণ জমিদারদ্বয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে উভয়কে পরাজিত করেন। ১৮৪২ সালে ফরিদপুরের জমিদার জয়নারায়ণবাবু প্রবলভাবে বিপ্লবীদের বাধা দেন। ফলে যুদ্ধ ব্যাপক আকার ধারণ করে। ওই হামলায় ৮০০ জন মুসলিম বিপ্লবী যুক্ত ছিলেন। জমিদাররা ইংরেজ আদালতে মামলা করলে বিচারে ২২ জনের ৭ বছরের জেল হয়। আলাউদ্দিন অবশ্য মুক্তি পান। অনেকের মতে, তাঁর শাস্তি হলে হীতে বিপরীত হত। কারণ রিপোর্ট অনুযায়ী সেই সময় তাঁর হাতে ৮০ হাজার লোক প্রাণ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।

১৮৪১ ও ৪২’র ঘটনার পর জমিদারগণ আর মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহসী হননি। কিন্তু তারা ইংরেজ সংবাদ মাধ্যমের সহায়তায় জমিদারের সাথে শোষিত মানুষের এই লড়াইকে সাম্প্রদায়িক লড়াই বলে প্রচার করেন।

ওই সময় কাসিমপুরের নীলকুঠীরের প্রভাবশালী সাহেব ডানলপ এবং তার পার্শ্বচর কালী প্রসাদ কাঞ্জীলাল নামে এক গোমস্তা আটশো সশস্ত্র লোক নিয়ে বাহাদুরপুরে মাওলানা আলাউদ্দিনের বাড়িতে হামলা করে। চার প্রহরীকে হত্যা করে ও বাড়ির বহুজনকে আহত করে দেড় লক্ষ টাকার অর্থ ও সম্পদ নিয়ে চলে যায়। আলাউদ্দিন প্রতিশোধ নিতে ১৮৪৬’র ৫ ডিসেম্বর ডানলপের কুঠীর আক্রমণ করেন এবং সেই গোমস্তাকে হত্যা করে।

ডানলপ সাহেব কোর্টে কেস করলে আলাউদ্দিনসহ ৬৩ জন বিপ্লবীর শাস্তির রায় বের হয়। সেই রায়ের বিরুদ্ধে কলকাতার সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করা হলে সবাইকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। ১৮৫৭ তে মুক্তি পেয়ে তিনি আবার মানুষকে সচেতন করতে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৮৫৭’র স্বাধীনতা যুদ্ধ ভয়াবহ রুপ নেওয়ার পূর্বে আবার তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে দেওয়া হয়। সেখানে তাকে প্রচন্ড অত্যাচার ও দূর্ব্যবহার করা হয়। ১৯৬০ সালে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। জেল থেকে বাইরে এসে যতদিন জীবিত ছিলেন, জেলের অত্যাচারের রেশ টেনে যেতে হয় মৃত্যু পর্যন্ত। ১৮৬২ সালের ২৪ অক্টোবর এই মহান দেশপ্রেমী চিরনিদ্রায় শায়িত হন।

আলাউদ্দিন সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর যোগ্য পুত্র গিয়াসুদ্দিন হায়দার সামরিক নেতা হিসাবে বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। তাঁর আর এক ভাই আব্দুল গফুরও সশস্ত্র বিপ্লবে যুক্ত ছিলেন।

এই দেশপ্রেমিক ও তেজদ্বীপ্ত বিপ্লবীরা বংশানুক্রমিকভাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে পার্থিব ধ্বংসকে বরণ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু আজ ইতিহাস ভুলে গেছে এই নিঃস্বার্থ বিপ্লবীদের।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here