চলতি বছরের ৯-১২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যাকিং সম্মেলন ‘ডেফকন-২৬’। বিশ্বের হ্যাকারদের অন্যতম এই মিলনমেলায় সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিলো ১১ বছরের শিশু অদ্রে জোনসের হাতে ফ্লোরিডার স্টেট ভোটিং ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের ঘটনা। অদ্রে জোনস মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে ওই ওয়েবসাইটটিতে ঢুকে পড়েছিলো। এমনকি ভোটের ফলাফলও বদলে দিয়েছিলো সে। অদ্রে জোনসের মতো আরো অন্তত ৩০ জন শিশু হ্যাকারও দ্রুততম সময়ের মধ্যে একই ধরনের কাজে সফল হয়েছিলো। আয়োজকদের উদ্দেশ্য ছিলো তরুণ ও শিশু হ্যাকাররা কে, কত কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট হ্যাক করতে পারে, তা নির্ধারণ করা। এজন্য বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটের নকল তৈরি করা হয়েছিল। ১১ বছরের জোনস মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে এসব ওয়েবসাইটের একটি পাতায় প্রবেশ করতে সমর্থ হয়েছিলো। সেখানে সে তার ইচ্ছেমত প্রার্থীর নাম ও ভোটের সংখ্যা বদলে দিতে পারতো। আয়োজকরা জানান, ৩০ জনের বেশি শিশু আধ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে ওয়েবসাইটগুলো হ্যাক করতে পেরেছিল।

শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, ২০১৭ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রান-অফের কিছুক্ষণ আগে বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর দলের কয়েক হাজার গোপন নথিপত্র প্রকাশ করে দেয়া হয়েছিল। এদিকে, জার্মানির ডার্মস্টাটের মার্টিন চিরজিশ নামে কম্পিউটার বিজ্ঞানের এক শিক্ষার্থী গতবছর জার্মান নির্বাচনের ফলাফল মূল্যায়নে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের দুর্বলতা তুলে ধরেছিলেন। ‘পিসি-ভাল’ নামের ওই সফটওয়্যারের পাসওয়ার্ড তিনি অনলাইনে খুঁজে পেয়েছিলেন। সফটওয়্যারের কোডেও তিনি প্রবেশ করতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে চিরজিশ এই দুর্বলতার কথা নির্বাচন কর্তৃপক্ষকে জানালে ওই সফটওয়্যার ব্যবহার থেকে সরে আসে তারা। প্রায় সব সফটওয়্যারই আগে কিংবা পরে হ্যাক করা সম্ভব। তাই মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানের অধ্যাপক হেল্ডারম্যান মনে করেন, এই ডিজিটাল যুগেও অ্যানালগ পদ্ধতিতে ভোটদানের ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অ্যানালগ পদ্ধতির পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, কাগজপত্রের মাধ্যমে ভোট দেয়ার ব্যবস্থা থাকা সব সময়ই ভালো। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ যেখানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভোট দেয়ার ব্যবস্থা আছে সেখানে কারচুপি হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। ফলে অ্যানালগ পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ ব্যবস্থা অবশ্যই থাকা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ৬ নভেম্বর আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রায় ২০টি রাজ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ এসব মেশিন যে কতটা অরক্ষিত তা কয়েকবারই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অ্যালেক্স হেল্ডারম্যান। মার্কিন কংগ্রেসকেও তিনি এই বিষয়টি জানিয়েছিলেন। মার্কিন কম্পিউটার বিজ্ঞানী এলেক্স হাল্ডারম্যান দেখিয়েছেন কত সহজে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন হ্যাক করে ভোটের ফলাফল পরিবর্তন করা সম্ভব। এভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা হলে কারা ও কীভাবে তা করেছে বা আদৌ নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে কি না তা ধরার কোনো উপায়ও থাকে না তাও দেখিয়ে দিয়েছেন হাল্ডারম্যান। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বোস্টনের এক প্রযুক্তি সম্মেলনে তিনি বিষয়টি সবার সামনে স্পষ্ট করেন। হাল্ডারম্যান একটি ছদ্ম নির্বাচনের আয়োজন করেন যেখানে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী তিন জন জর্জ ওয়াশিংটনের পক্ষে ভোট দেন। কিন্তু হ্যাকিংয়ের শিকার মেমোরি কার্ডে ফলাফল আসে জর্জ ওয়াশিংটন পেয়েছেন ১ ভোট আর বেনেডিক্ট আরনল্ড পেয়েছেন ২ ভোট। হাল্ডারম্যান যে ভোটিং মেশিনকে সহজেই হ্যাকিং করা যায় বলে দেখালেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি অঙ্গরাজ্যে ব্যবহৃত হয়। এই মেশিনের কোনো ব্যালট পেপার নেই। আর তাই ভোটের ফলাফল পাল্টে দিলে তা ধরার বা চ্যালেঞ্জ করার কোনো উপায় থাকে না। সম্মেলনে অন্যান্য গবেষকরা দেখিয়েছেন, ভোটিং মেশিং অথবা নেটওয়ার্কে হ্যাকিং সম্ভব।

এমন পরিস্থিতিতে গোটা বিশ^জুড়েই ইভিএমকে ঘিরে সন্দেহ, সংশয় ও আস্থাহীনতা বাড়ছে। বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা তুমুল আপত্তি ও বিতর্কের মুখে পড়েছে।
ভারতেও ক্ষমতাসীনরা ব্যতীত প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল এই ইভিএমের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। দেশটিতে ক্ষমতাসীনরা চাইলেও বিরোধীদের ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের দাবি ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। গত বছর দেশটির কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে ভোটে ব্যাপক জালিয়াতি, কারচুপির প্রমাণ মিলেছে। দেশটির মধ্যপ্রদেশের নির্বাচনে ভোটের আগে ইভিএম পরীক্ষায় দেখা গেছে, যন্ত্রটি ব্যবহার করলে শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দলের প্রতীকই বের হয়ে আসছে। এ ঘটনায় ওই সময় নির্বাচন কমিশনের দুজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। রাজ্যটিতে ভোট অনুষ্ঠানের আগে ইভিএম পরীক্ষা করার সময় কর্মকর্তারা দেখতে পান, যন্ত্রটিতে যে কোনও বোতাম চাপলেই শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি’র নির্বাচনী প্রতীক আঁকা স্লিপ বের হয়ে আসছে।

কর্মকর্তাদের ইভিএম পরীক্ষার এই ভিডিওটি সে সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় দুই দশক আগে ভারতের নির্বাচনে প্রথম ইভিএম ব্যবহার করা হলেও এখন অন্তত ৭০ ভাগ রাজনৈতিক দল অভিযোগ করছে ইভিএমে ভোট জালিয়াতির সুযোগ রয়েছে। এমনকি যে কংগ্রেসের হাত ধরে ইভিএমে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছিলো সেই কংগ্রেসই সবচেয়ে বেশি এর অপপ্রয়োগের আশঙ্কা করে বিরোধিতা করছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের বক্তব্য, ইদানিং বহু জায়গায় ভোটগ্রহণ চলাকালীন ইভিএম খারাপ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তারপর ওইসব বুথের ফলাফলে দেখা গেছে শাসক দল জয়ী হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, যে-কোনো প্রতীকের বোতাম টিপলেই বিজেপি প্রার্থীর পক্ষে ভোট পড়ে। গত কয়েক বছরে উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র-সহ বিজেপি-শাসিত বহু রাজ্যে ইভিএম কারচুপির ঘটনা নজরে এসেছে। দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইভিএম নিয়ে সন্দেহ, সংশয় আর অবিশ্বাস ক্রমেই পাকাপোক্ত হচ্ছে। বিরোধীরা মনে করছে, ইভিএমে ভোট হলে এর অপব্যবহার করে যেভাবেই হোক জয় ছিনিয়ে নেবে শাসক দল বিজেপি। ভারতের কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম, সিপিআই, সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি, ডিএমকে, টিডিপি, আম আদমি পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, ন্যাশনাল কনফারেন্সসহ প্রায় সবকটি বিরোধী দল ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালটে ভোট করানোর দাবি তুলেছে। এমনকি বিজেপির দীর্ঘদিনের সঙ্গী এনডিএ শরিক মহারাষ্ট্রের শিবসেনাও ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালটে ভোট করানোর জন্য গলা চড়িয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় বলেছেন, ‘বিশ্বের বহু উন্নত দেশ ইভিএম ছেড়ে ব্যালটে ফিরে এসেছে। কারণ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইভিএমে কারচুপি করার আশঙ্কা থেকেই যায়।’ অভিজ্ঞ এই রাজনীতিকের অভিযোগ, ইভিএমের ভোটে উত্তর প্রদেশ ও গুজরাটে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় শুধু রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জনমানসে চরম সরকার-বিরোধিতা সত্ত্বেও কীভাবে বিপুল ভোটে জয়ী হচ্ছে বিজেপি? তারপর কয়েকটি রাজ্যের লোকসভা উপ-নির্বাচনের দিকে তাকালে ছবিটা আরো স্পষ্ট হয়। কৈরাণা কেন্দ্রের নির্বাচনে এক নির্দল প্রার্থী লড়েছিলেন। ফল ঘোষণার পর দেখা গেছে, তিনি তাঁর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ভোটটুকুও পাননি!
ভারতে যখন ইভিএম বাতিল করে পুরনো ব্যালটে ফিরে যাওয়ার জোর দাবি উঠেছে, বাংলাদেশে তখন প্রশ্নবিদ্ধ এই ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহারের তোড়জোড় করছে নির্বাচন কমিশন।


ইভিএমের যতো খারাপ দিক

ইভিএমে যতোটা না সুবিধার কথা বলা হয় সমস্যা তার চেয়েও বেশি। সবচেয়ে বড় অন্তরায় হচ্ছে স্বচ্ছ ভোটের নিশ্চয়তা। বিশেষজ্ঞরা ইভিএমের অন্তত ৭ টি খারাপ দিক খুঁজে পেয়েছেন। যেমন

(১) কথায় আছে জোর যার মুল্লুক তার। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের দ্বারা কেন্দ্র দখলের পর পোলিং এজেন্টদের নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটে। ইভিএমে ভোট হলে এক্ষেত্রে সর্বাধিক সংখ্যক ভোট শক্তির মালিক হবে প্রভাবশালীমহল।

(২) বরাবরই শোনা যায় যে নির্বাচন কমিশনে দলীয় লোক ঢুকে পড়ে। এমনটা ঘটলে তাদের কেউ যদি প্রতি কেন্দ্রে অন্তত একটি করে মেশিনে এ প্রোগ্রাম করে দেন যে, নির্বাচন শেষে ক্লোজ বাটনে ক্লিক করলেই যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট কোনো প্রতীকে অতিরিক্ত ২০০/৩০০ ভোট যুক্ত হবে তাহলে সহজেই নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেয়া সম্ভব।

(৩) মাইক্রোকন্ট্রোলারের প্রোগ্রাম পরিবর্তনের সুযোগ হলে কোনো কেন্দ্রে সকল প্রার্থী একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক (২০ বা ৫০ বা ১০০) ভোট পাবার পর যে কোনো ব্যালট বাটনে চাপলেই অতিরিক্ত ভোট দখলকারী প্রার্থীর প্রতীকে যুক্ত হবে, এমন প্রোগ্রামও লিখে ব্যালট ছিনতাই সম্ভব।

(৪) যদি নির্বাচনী কর্মকর্তার স্মার্ট কার্ডের নকল কার্ড তৈরি করা হয় এবং তা যদি ইভিএমের প্রোগ্রামকে বিভ্রান্ত করে একবারে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট কাস্ট করে দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয় তাহলে তা নির্বাচনের ফলাফলকে সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দিবে।

(৫) গোপনে যে ইভিএম সরবরাহ করা হবে না এমন নিশ্চয়তা অন্তত বাংলাদেশে আশা করা যায় না। ইভিএমের প্রতিটি ইউনিট চালু অবস্থায় পৃথক করা যায়। প্রভাবশালীদের দ্বারা কেন্দ্র দখলের পর গোপনে সরবরাহকৃত অগ্রিম ভোট দেয়া ইভিএমের শুধুমাত্র কন্ট্রোল ইউনিট প্রতিস্থাপন করলেই চলবে। ফলাফল শতভাগ অনুকূলে।

(৬) মাইক্রোকন্ট্রোলার চিপ নিয়ন্ত্রিত এই ইভিএমের প্রতিটি স্মার্টকার্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে আরএফআইডি (রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন) ট্যাগ। অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতা পেলে কোনো প্রার্থীর কর্মীরা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে কয়েকশ মিটার দূর থেকেও কন্ট্রোল ইউনিট নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে।

(৭) বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনটি ভারতের মেশিনগুলোর কাছাকাছি মানের। ২০১০ সালের ১২ আগস্ট ‘ভারতের ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন জালিয়াতি প্রতিরোধক নয়’ দাবি করে একদল মার্কিন আইটি বিশেষজ্ঞ বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, ‘ভারতের ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন জালিয়াতি প্রতিরোধক নয় এবং দেশটির নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ ও নিরাপদ ভোট গ্রহণ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা উচিত।’ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেন আডিডা, মাইক্রোসফট গবেষক ড. জোশ বেনালো ও পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাট ব্লেইজ এই বক্তব্য দিয়েছিলেন। তারা বলেন, ‘ইভিএম তৈরির পর নতুন ধরনের নিরাপত্তা হামলার বিষয় জানা গেছে ও ইভিএমের নিরাপত্তার বিষয়টি পুরনো হয়ে গেছে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী ফলাফলের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও যাচাইযোগ্যতা ভারতীয় ইভিএম দিতে পারে না।’


ইসি মাহবুব তালুকদার যা বলেছেন

ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যেমন তীব্র বিরোধিতা এসেছে তেমনি নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরেও এ নিয়ে তুমুল বিরোধিতা রয়েছে। ইভিএম ব্যবহার নিয়ে আইন সংস্কারের উদ্যোগে ভিন্নমত পোষণ করেছেন খোদ একজন নির্বাচন কমিশনার। গত ৩০ আগস্ট এ নিয়ে নির্বাচনের কমিশন সভায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। সেখানে তিনি লিখেছেন, “আমি মনে করি, স্থানীয় নির্বাচনে ধীরে ধীরে ইভিএমের ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ সমর্থন করি না। ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তে ভিন্নমত পোষণ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রদান করছি।”

এই আপত্তির কারণ হিসেবে ইভিএম নিয়ে ‘বিদ্যমান রাজনৈতিক বিরোধিতা’ এবং ‘দক্ষ জনবলের অভাব’ এর কথা বলা হয়েছে ওই নোট অব ডিসেন্টে।
মাহবুব তালুকদার লিখেছেন,

(১) স্থানীয় নির্বাচনগুলিতে ইতোমধ্যে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রথম থেকেই বলে এসেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো সম্মত হলেই কেবল আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইভিএম ব্যবহারকে স্বাগত জানানো হলেও প্রধান বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করে আসছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দলগতভাবে সংলাপকালে ইভিএম সম্পর্কে সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান ছিল পরস্পর বিরোধী। এমতাবস্থায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহারের কোনো সম্ভাবনা নেই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অধিকতর আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন ছিল।

(২) বর্তমান নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ইভিএম ব্যবহারের প্রারম্ভে বলা হয়েছিল পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য ২৫৩৫টি ইভিএম ক্রয়ের নিমিত্ত ৫০ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারে আমি গত ৮ এপ্রিল তারিখে ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলাম। সম্প্রতি ইভিএম এর জন্য যে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মুখে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ইভিএম ক্রয় করা কতটা যৌক্তিক, তা বিবেচনাযোগ্য। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিগত রকিবউদ্দীন কমিশন ইভিএম ব্যবহার বাতিল করে অনেক ইভিএম ধ্বংস করে দেয়। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কখনোই কাম্য নয়। যে ইভিএম বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি থেকে সরকারি সংস্থার সুবাধে বিনা টেন্ডারে ক্রয় করা হচ্ছে, এর অরিজিন কী? কে উদ্ভাবন করেছে কিংবা কোত্থেকে আমদানি করা হচ্ছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কারিগরি দিক থেকে এটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত কি না তা আরো পরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করার পর অদ্যাবধি প্রকল্পের সম্ভাবতা যাচাই করা হয়নি বলে জানা যায়।

(৩) একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য অতি অল্প সময়ের মধ্যে আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আরপিওতে শুধু ইভিএম ব্যবহারের জন্য যে সংশোধনী আনা হয়েছে, তা ইতিমধ্যে কমিশন সভায় নানা প্রকার প্রশ্নের সম্মুখীন। আমি ধারণা করি, সর্বসম্মত রাজনৈতিক মতের বিরুদ্ধে ইভিএম ব্যবহার করা হলে তা নিয়ে আদালতে অনেক মামলার সূত্রপাত হবে। অন্যান্য কারণ ব্যতিরেকে কেবল ইভিএম ব্যবহারের কারণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এই অনাবশ্যক ঝুঁকি নেওয়া সঙ্গত হবে না।
(৪) যন্ত্রের অগ্রগতির যুগে আমি ব্যক্তিগতভাবে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধী নই। এ ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ঘাটতি দৃষ্টিগোচর। প্রথমত, ইভিএম ব্যবহারের জন্য নির্বাচন কমিশন যাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তাদের প্রশিক্ষণ অপর্যাপ্ত এবং জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান সম্পর্কে আমি সন্ধিহান। দ্বিতীয়, অনেক ভোটার অজ্ঞতাপ্রসূতকারণে ইভিএম ব্যবহার সম্পর্কে অনীহা প্রকাশ করেছে। তারা ইভিএমের বিষয়ে যে সন্দেহ প্রকাশ করছেন তা নিরসনের জন্য ব্যাপক প্রচার ও ভোটারদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল। বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম নিয়ে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাও ঘটেছে, যা ছিল নিতান্তই অনভিপ্রেত। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কেন্দ্র দখল করে ইভিএম-এ একটি দলের পক্ষে ভোট প্রদানের অভিযোগও রয়েছে। তবে আমি মনে করি, স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ধীরে ধীরে ইভিএমের ব্যবহার বাড়ানো হলে ভোটাররা তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন। এই অভ্যস্ততার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন তা একাদশ জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তবে স্থানীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার সাফল্য লাভ করলে ৫-৭ বছর পরে জাতীয় নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহার অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।

(৫) উল্লেখিত অভিমতের আলোকে আমি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ সমর্থন করি না। এমতাবস্থায় উক্ত নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তে ভিন্নমত পোষণ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রদান করছি।’

তারপরও ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ

যেকোনো বিবেকবান মানুষ স্বীকার করবেন- মাহবুব তালুকদার তার লিখিত নোট অব ডিসেন্টে যেসব যুক্তি তুলে ধরেছেন, তার একটিও অযৌক্তিক কিংবা ফেলনা নয়। অথচ ৪ জন নির্বাচন কমিশনার এর বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়ে আরপিও সংশোধন করে আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে তাদের অবস্থান ঘোষণা করলেন। সে জন্যই দলকানা কিছু মানুষ ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রশ্নে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর তাদের আস্থা রাখতে পারছে না। তা ছাড়া এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত কোনো উপনির্বাচন, স্থানীয় নির্বাচন, বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়নি। তবে এরই মধ্যে যে ক’টি নির্বাচনে সরকারবিরোধী প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন, তা শুধু সম্ভব হয়েছে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের কারণেই।

গত বছর অনুষ্ঠিত অংশীজনের সাথে ইসির সংলাপের একটি বিষয় ছিল ইভিএম। ২০১৭ সালে যে ৪০টি রাজনৈতিক দল ইসির সাথে নির্বাচনী সংলাপে অংশ নেয়, এর মধ্যে বিএনপিসহ ৩৫টি দলই ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে তাদের মত দেয়। বাকি যে পাঁচটি দল ইভিএমের পক্ষে মত দেয় সেগুলো হচ্ছে : আওয়ামী লীগ ও এর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দল বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এম-এল) এবং জাকের পার্টি। এমনকি সরকারের শরিক জাতীয় পার্টিও ইভিএমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার প্রেক্ষাপটেই নির্বাচন কমিশন একসময় বলেছিল, সব দল একমত না হলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা না করেই হঠাৎ করে ইভিএম ব্যবহারে ইসির এই তোড়জোড়কে দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল-মহল ও সাধারণ মানুষ সন্দেহের চোখে দেখছেন এবং দেখাটাই স্বাভাবিক। হঠাৎ করে ইসির ইভিএম ব্যবহারের এই তোড়জোড়ের বিষয়টিকে আসলে সরকারি বলয়ের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলো ‘ডিজিটাল রিগিংয়ের’ আশঙ্কা হিসেবে দেখছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আশঙ্কা, একদম শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ করে ইসির এই উদ্যোগ আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী করার সরকারি ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ মাত্র। তারা বলছে, ইভিএম ত্রুটিপূর্ণ ও এর ওপর আস্থা রাখা যায় না। আর এটি হ্যাকিং করা যায়, এবং ম্যানিপুলেট করা যায়। এতো কিছুর পরও নির্বাচন কমিশনই বা হঠাৎ করে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের মতামত উপেক্ষা করে ইভিএম ব্যবহারে এতটা উৎসাহীই বা কেন হলো- সেটাও সন্দেহজনক।

বিরোধীরা যা বলছেন

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করে বলেছেন, ইভিএম ব্যবহারে ইসির এই তাড়াহুড়া রাজনৈতিক অসৎ-উদ্দেশ্যতাড়িত। এর লক্ষ্য নির্বাচনে কারচুপি করা। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, এই উদ্যোগ ডিজিটাল রিগিংয়ের পথকেই খুলে দেবে। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে চায়। তিনি আরো বলেন, কিছু লোক প্রচুর টাকা তসরুপ করবে ইভিএম কেনার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ সমাজবাদী দলের সভাপতি খালেকুজ্জামান বলেছেন, ইভিএম ব্যবহার আওয়ামী লীগের জন্য নিরাপদে ভোট জালিয়াতির সুযোগ করে দেবে। তিনি ইসির প্রতি ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধে আহ্বান জানান। তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ইভিএম ব্যবহার প্রত্যাখ্যান করবে। বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, এই উদ্যোগ সন্দেহজনক এবং ইসি আওয়ামী লীগের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছে। এদিকে ইভিএম কেনার পরিণতি সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করেছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘ইভিএম-টিভিএম কেনার উদ্যোগ ত্যাগ করুন। আমরা ইসিকে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, ডিজিটাল জালিয়াতির পথ থেকে সরে আসুন। অন্যথায় ষড়যন্ত্রকারী প্রত্যেকেই এর মূল্য দিতে হবে।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার হঠাৎ কী কারণে, কাকে জয়ী করতে এবং কার নির্দেশে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন?’ তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ এখন জনগণের ওপর আস্থা হারিয়ে যন্ত্রের ওপর ভর করেছে। জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের একটি ‘অশুভ পার্টনারশিপ’। এর পুরো দায় নির্বাচন কমিশনকে বহন করতে হবে।

ইভিএম কি- এ বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন নাগরিকের প্রতিক্রিয়ায় তা একেবারে খোলামেলাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘ইভিএম নামের এই মেশিনটা পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ফাইজলামিগুলোর মধ্যে সেরা ফাইজলামি। আপনি ভোট দিবেন হারুন মোল্লাকে, মেশিন জিতিয়ে দিবে নরেন কাকুকে। আহা! কী চমৎকার । সারাদিন ভোটাররা টিপাটিপি করে ভোট দিয়ে যাবে একজনকে, আর দুরে রিমোট কন্ট্রোল নিয়ে বসে থাকা অপারেটর মেশিন চালিয়ে জিতিয়ে দিবে আরেকজনকে। গদি দখলের এরচেয়ে সস্তা এবং সহজ রাস্তা আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।’


শীর্ষকাগজের সৌজন্যে:

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here