কবির আহমদ কাসেমী :
যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশকের মর্যাদা কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এক থেকে নয় তারিখ পর্যন্ত রোযা রাখার বিশেষ ফযীলতও রয়েছে। তবে আরাফার দিন তথা যিলহজ্বের নয় তারিখের রোযার গুরুত্ব একটু বেশি। কারণ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ، وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ.
“আরাফার দিনের রোযার ব্যাপারে আমি আল্লাহ তাআলার কাছে আশাবাদী যে, এই রোযার বদৌলতে পূর্বের এক বছর এবং পরের এক বছরের গুনাহ তিনি মিটিয়ে দিবেন।”
(সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১১৬২/জামে তিরিমিযী: ৭৪৯)।
আরাফার দিন বলে যিলহজ্বের নয় তারিখ উদ্যেশ্য। হাজ্বীগণ নয় তারিখে হজ্বের আনুষ্ঠানিকতায় আরাফার ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করেন। কিন্তু এই দিনের রোযা তাদের জন্য সুন্নাত নয়।
হাজ্বীদের জন্যে আরাফার রোযা রাখার ব্যাপারে হযরত ইবনে ওমর রা.-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন—
حَجَجْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمْ يَصُمْهُ، وَمَعَ أَبِي بَكْرٍ فَلَمْ يَصُمْهُ، وَمَعَ عُمَرَ فَلَمْ يَصُمْهُ، وَمَعَ عُثْمَانَ فَلَمْ يَصُمْهُ…
“আমি নবী কারীম ﷺ-এর সাথে হজ্ব করেছি, তিনি এ দিনে রোযা রাখেননি, আবু বকরের সাথে হজ্ব করলাম, তিনিও রোযা রাখেননি, ওমরের সাথে করলাম, তিনিও রোযা রাখেননি, ওসমানের সাথে করলাম, তিনিও রোযা রাখেননি…।”
(জামে তিরমিযী: ৭৫১)।
সুতরাং বোঝা গেল, এই রোযাটি মূলত আরাফার মাঠে অবস্থানের সাথে সম্পৃক্ত নয়। তাই তো নবীজী আরাফার মাঠে রোযা না রাখলেও অন্য সময়ে যিলহজ্বের নয় তারিখের রোযা ঠিকই রাখতেন। হযরত উম্মে সালামা রা. বলেন—
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ، وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ…
“রাসূল ﷺ যিলহজ্বের নয় তারিখ ও আশুরার দিন রোযা রাখতেন।”
(সুনানে আবু দাঊদ: ২২৩৩৪)।
এই হাদীস দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হলো, আরাফার ময়দানের সাথে এই রোযার সম্পর্ক নেই, বরং এটি যিলহজ্বের নয় তারিখে রাখতে হয়। তাই আরাফার অবস্থানের প্রতি লক্ষ্য না রেখে প্রত্যেক দেশের নয় তারিখে রোযাটি রাখতে হবে। ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে আগামীকাল যিলহজ্বের নয় তারিখ। আজ রাতে সাহরী খেয়ে রোযাটি রাখা লাগবে কাল।
জামিয়া উলূমে ইসলামিয়া আল্লামা ইউসুফ বানূরী টাউন করাচী’র ফতোয়া বিভাগের ওয়েবসাইটে আরও বিস্তারিত উল্লেখ আছে।
(লিংক: is.gd/vG9xpd)
সৌদি আরবের প্রসিদ্ধ আলেম শাইখ ইবনে উছাইমিন রহ. এবং শাইখ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ হাফি.ও এমন ফতোয়াই দিয়েছেন।
(লিংক: is.gd/3AC4fk)
.
আারাফায় অবস্থানরতদের সাথে মিলিয়ে রোযা রাখা অসম্ভব প্রায়। এমনিতেই তো কয়েকঘণ্টার সময়ের ব্যবধান দেখা যায়। আমরা সাহরী খাওয়া শুরু করলে তারা হয়তো আরাফায় গিয়ে পৌঁছবে না, এমনিভাবে আরাফার কার্যক্রম শেষও হবে না, কিন্তু আমরা ইফতার করে ফেলব! আরাফার আনুষ্ঠানিকতার সময় তো অনেক দেশে রাত থাকে, তারা কি করে রোযা রাখবে?
পশ্চিমের এমনও রাষ্ট্র আছে যেখানে সৌদির একদিন আগে চাঁদ দেখা যায়, তো তারা যদি সৌদির সাথে আরাফার রোযা রাখে তাহলে তো তাদের ঈদের দিন রোযা রাখা লাগবে! অথচ সর্বসম্মতিক্রমে ঈদের দিন রোযা রাখা নিষেধ। তাই যার যার দেশের চাঁদের হিসেব ছাড়া কোনো গতি নেই। ইউটিউব থেকে গজিয়ে উঠা কেউ কেউ উভয় কূল ঠিক রাখার জন্যে আট ও নয় তারিখ দু’দিন আরাফার রোযা রাখার ফতোয়া দিচ্ছে। জনসাধারণকে যেটা খুশি সেটার ওপর আমল করার প্রতিও উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। এগুলোকে আমরা স্পষ্ট গুমরাহি মনে করি। শরীয়তের কিছু বিধান মতভেদপূর্ণ থাকলে একসাথে উভয়টার ওপর আমল করা কখনো সম্ভব হয় না, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ইচ্ছামত যে কোনো একটা বেছে নেয়ারও সুযোগ নেই। বসে প্রস্রাব করার হাদীস তো আছেই, প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে প্রস্রাবের পক্ষেও হাদীস পাওয়া যায়, এখন কি বলা হবে, একজন ব্যক্তি অর্ধেক প্রস্রাব করবে দাঁড়িয়ে, আর বাকিটা সারবে বসে? অন্য মাযহাবের মুসল্লিরা নামাযের রুকুতে যাওয়া-আসার সময় রফয়ে ইদাইন তথা উভয় হাত উত্তোলন করে, ইমামের পেছনে সূরা ফাতেহাও পড়ে, এখন উভয় প্রকারের হাদীসের ওপর আমল করতে গিয়ে কি আমরাও চার রাকআত নামাযের দুই রাকআতে হাত ওঠাব, ফাতেহা পড়ব, আর বাকি দুই রাকআতে হাত ওঠাব না, ফাতেহাও পড়ব না? এভাবে মনগড়া আমলের দ্বারা শরীয়তের বিধানগুলো হাস্যকর হয়ে দাঁড়াবে। তাই দলীলের ভিত্তিতে যে কোনো একটা মতের ওপর আমল করতে হবে। জনসাধারণের যেহেতু কুরআন-হাদীসের প্রমাণাদি যাচাই করার যোগ্যতা নেই সেহেতু তাদের জন্য নিজেদের মাযহাববিষয়ক গবেষণা বোর্ডের অনুসরণ করা আবশ্যক। আমাদের হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য গবেষণা বোর্ড-ফতোয়া বিভাগ দারুল উলূম দেওবন্দ ভারত, জামিয়া বানূরী টাউন করাচী পাকিস্তান এবং মারকাযুদ দাওয়া ঢাকা’র সম্মিলিত অবস্থান হলো, আরাফার রোযা যার যার দেশের চাঁদের হিসেব অনুযায়ী যিলহজ্বের নয় তারিখেই রাখতে হবে।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here