-মুফতী সাখাওয়াত হোসাইন রাযী

# নির্ধারিত বিষয় কেউ খন্ডাতে পারে না। এরশাদ হচ্ছে-
قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلَانَا وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُون “হে নবী! আপনি বলে দিন! আল্লাহ আমাদের জন্য (তাকদীরে) যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া অন্য কোনো কষ্ট আমাদেরকে কিছুতেই স্পর্শ করবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহর উপর মুমিনদের ভরসা রাখা উচিত।” (সূরা তাওবা : ৫১)

# ভালো মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে। এরশাদ হচ্ছে-
أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِككُّمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنتُمْ فِي بُرُوجٍ مُّشَيَّدَةٍ ۗ وَإِن تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هَٰذِهِ مِنْ عِندِ اللَّهِ ۖ وَإِن تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هَٰذِهِ مِنْ عِندِكَ ۚ قُلْ كُلٌّ مِّنْ عِندِ اللَّهِ ۖ فَمَالِ هَٰؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا
“তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরে অবস্থান করো, তবুও। বস্তুতঃ তাদের কোন কল্যাণ সাধিত হলে তারা বলে যে, এটা সাধিত হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয় তবে বলে, এটা হয়েছে তোমার পক্ষ থেকে। বলে দাও এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। পক্ষান্তরে তাদের পরিণতি কি হবে যারা কখনো কোনো কথা বুঝতে চেষ্টা করে না।” (সুরা নিসা- ৭৮)

# এবাদতে নিমগ্ন থাকুন। এরশাদ হচ্ছে-
وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَى بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ “আর আপনার রব এমন নন যে, তিনি জনপদসমূহকে নির্বিচারে ধ্বংস করে দেবেন অথচ তার অধিবাসীরা সৎকর্মশীল।” (সূরা হুদ : ১১৭)

# বেশি বেশি তওবা করুন। এরশাদ হচ্ছে-
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ “আর আল্লাহ তায়ালা এমন নন যে, আপনি তাদের মাঝে বর্তমান থাকা অবস্থায় তাদেরকে শাস্তি দেবেন এবং তিনি এমনও নন যে, তারা ইস্তিগফারে রত থাকা অবস্থায় তাদেরকে শাস্তি দেবেন। (সূরা আনফাল : ৩৩)

# ছোঁয়াচে রোগের জাহেলী ধারণা থেকে ঈমান হেফাজত করুন

ইসলামের দৃষ্টিতে ছোঁয়াচে রোগ বলতে কোন রোগ নেই। রসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ وَفِرَّ مِنْ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الْأَسَدِ

রোগের সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই। পেঁচার ডাকে অশুভ কিছু নেই, সফর মাসেও অশুভ কিছু নেই। আর কুষ্ঠরোগী থেকে সেভাবে পলায়ন কর, যেভাবে সিংহ থেকে পলায়ন কর। (বুখারী ৫৭০৭, মিশকাত ৪৫৭৭)

এ হাদীসের শেষাংশে কুষ্ঠরোগী থেকে পলায়ন করতে বলা হয়েছে। তা এইজন্য যে, যাতে রোগীর কষ্ট বৃদ্ধি না পায় এবং দুর্বল ঈমানের অধিকারীরা শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে পারে। কেননা হাদীসের প্রথমাংশে স্পষ্টই বলা হয়েছে যে ছোঁয়াচে বলতে কোন কিছু নেই।

لَا يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ “অসুস্থ উটের মালিক যেন সুস্থ উটের মালিকের উটের কাছে অসুস্থ উটগুলো নিয়ে না যায়” হাদিসের ব্যাখ্যাও অনুরূপ। যাতে মানুষের ঈমান-বিশ্বাস হেফাজতের সাথে সাথে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতাও রক্ষা পায়।
এমন কি ছোঁয়াচে রোগের জাহেলী ধারণা বিলুপ্ত করতেই রসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে বসে খাবার খেয়েছেন আর বলেছেন- كُلْ بِسْمِ اللَّهِ ثِقَةً بِاللَّهِ وَتَوَكُّلًا عَلَيْهِ “আল্লাহর উপর আস্থা রেখে আল্লাহর নামে খাওয়া শুরু করো” (তিরমিযী শরিফ)

হযরত আয়িশা (রা.) বলেন-
كَانَ لَنَا مَوْلَى مَجْذُومٌ فَكَانَ يَأْكُلُ فِي صِحَافِي وَيَشْرَبُ فِي أَقْدَاحِي وَيَنَامُ عَلَى فِرَاشِي “আমাদের একজন আযাদকৃত গোলাম ছিলো–যে কুষ্ঠরোগী ছিলো। সে আমার বরতনে খাবার খেতো, আমার গ্লাসে পানি পান করতো এবং আমার বিছানায় ঘুমাতো।” (তুহফাতুল আহওয়াযী শারহু জামি‘ তিরমিযী, ৫ম খণ্ড, ৪৩৮ পৃষ্ঠা)

এছাড়া অন্য এক বর্ণনায় এসেছে-

عن أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قَالَ : إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لاَ عَدْوَى وَلاَ صَفَرَ وَلاَ هَامَةَ. فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ: يَا رَسُول اللهِ، فَمَا بَالُ إِبِلِي تَكُونُ فِي الرَّمْلِ كَأنَّهَا الظِّبَاءُ، فَيَأْتِي الْبَعِيرُ الأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ بَيْنَهَا فَيُجْرِبُهَا؟ فَقَال : فَمَنْ أَعْدَى الأَوَّلَ؟.

“হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন… لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ উপস্থিত এক বেদুঈন আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা মরুভূমিতে কিছু উট দেখি যেগুলো পরিপূর্ণ সুস্থ অবস্থায় মরুভূমিতে চড়ে। কিন্তু হঠাৎ যখন তাতে খুজলিযুক্ত একটি উট প্রবেশ করে তখন অন্য উটগুলো খুজলিযুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহর রসূল তাদের জবাবে বললেন, তাহলে প্রথমটিকে কে সংক্রমিত করল?” (বুখারী শরীফ- ৫৭১৭)

এখন থেকে যায় আল্লাহর ইচ্ছায় সংক্রমিত হওয়ার বিষয়টি। প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে, আল্লাহর ইচ্ছায় সংক্রমিত হওয়া আর প্রচলিত ছোঁয়াচে ধারণা এক বিষয় নয়। কেননা ছোঁয়াচে ও সংক্রমণ হওয়ার পরিভাষাটি বস্তুবাদীদের।

কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারে যে, কোন কোন রোগের মধ্যে তো আল্লাহ প্রদত্ত সংক্রমণ ক্ষমতা থাকতে পারে যেমন আগুনের মধ্যে পুড়িয়ে ফেলার স্বভাব দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে পরিষ্কার কথা হচ্ছে, কোন রোগের স্বভাব সংক্রমণ নয়। যদি তাই হতো তাহলে যেই রোগীর কাছে যায় স্বাভাবিকভাবে সেই আক্রান্ত হতো। আল্লাহ তায়ালা যেটাকে সংক্রমিত করেন অর্থাৎ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে দেন সেটাই সংক্রমিত হয়।

তবে যদি রোগী কোন জীবাণু বহন করে এবং অন্যের তা থেকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে এই রোগীকে সতর্কতামূলক সুস্থ মানুষের মধ্যে আসতে না দেয়ার বিধান আছে। এর মানে এই নয় যে সুস্থ মানুষেরা তার সেবা যত্ন করবে না। আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে সেবা-যত্ন ছাড়তে পারবে না। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার সহ নানা সর্তকতা অবলম্বন করবে।

কেননা আল্লাহ চাইলে তাকে এ কারণ ছাড়া অন্য কারণেও আক্রান্ত করতে পারেন; কিংবা প্রথম ব্যক্তিকে যেভাবে আক্রান্ত করেছেন দ্বিতীয় ব্যক্তিকেও সেভাবে আক্রান্ত করতে পারেন। নিরাপদ দূরত্বে থেকে কোন মাধ্যম ছাড়াও কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে।

সর্বশেষ কথা হচ্ছে, ছোঁয়াচে রোগের জাহেলী ধারণার ফলে শুধুমাত্র ঈমান বিনষ্ট হবে না; সমাজ জীবনে ছড়িয়ে পড়বে চরম বিশৃঙ্খলা। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন!

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here