প্রসঙ্গ করোনাভাইরাস : মুফতী সাখাওয়াত হোসাইন রাযী


# মৃত্যু সম্পর্কে মূলনীতি

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ خَرَجُوا مِن دِيَارِهِمْ وَهُمْ أُلُوفٌ حَذَرَ الْمَوْتِ فَقَالَ لَهُمُ اللَّهُ مُوتُوا ثُمَّ أَحْيَاهُمْ

আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। অথচ তারা ছিল হাজার হাজার। তারপর আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে বললেন, মরে যাও। তারপর তাদেরকে জীবিত করেছিলেন। সূরা বাকারা- ২৪৩

أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِككُّمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنتُمْ فِي بُرُوجٍ مُّشَيَّدَةٍ ۗ وَإِن تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هَٰذِهِ مِنْ عِندِ اللَّهِ ۖ وَإِن تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هَٰذِهِ مِنْ عِندِكَ ۚ قُلْ كُلٌّ مِّنْ عِندِ اللَّهِ ۖ فَمَالِ هَٰؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا

তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরে অবস্থান করো, তবুও। বস্তুতঃ তাদের কোন কল্যাণ সাধিত হলে তারা বলে যে, এটা সাধিত হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয় তবে বলে, এটা হয়েছে তোমার পক্ষ থেকে। বলে দাও এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। পক্ষান্তরে তাদের পরিণতি কি হবে যারা কখনো কোনো কথা বুঝতে চেষ্টা করে না। সুরা নিসা- ৭৮

 قُل لَّكُم مِّيعَادُ يَوْمٍ لَّا تَسْتَأْخِرُونَ عَنْهُ سَاعَةً وَلَا تَسْتَقْدِمُونَ 

বলুন! তোমাদের জন্য একটি দিনের ওয়াদা রয়েছে। যাকে তোমরা এক মুহূর্তও বিলম্বিত করতে পারবে না এবং ত্বরান্বিতও করতে পারবে না। সূরা সাবা- ৩০ 

مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ ۚ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিরেকে কোন বিপদ আসে না এবং যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ তায়ালা সর্ববিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত। সুরা তাগাবুন- ১১

প্রশ্ন থেকে যায় যে, মৃত্যুর সময় ও স্থান নির্ধারিত থাকলেও রাসুল সা. মহামারীগ্রস্থ এলাকায় যেতে কেন নিষেধ করেছেন? যেমন হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- 

عن عبد الرحمن بن عوف رضي الله عنه أنه قال : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : إِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ بِأَرْضٍ فَلَا تَقْدَمُوا عَلَيْهِ ، وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلَا تَخْرُجُوا فِرَارًا مِنْه.

عن أُسَامَةَ بْن زَيْدٍ رضي الله عنهما قال : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ :  الطَّاعُونُ رِجْزٌ أَوْ عَذَابٌ أُرْسِلَ عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَوْ   عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ ، فَإِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ بِأَرْضٍ فَلَا تَقْدَمُوا عَلَيْهِ ، وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلَا تَخْرُجُوا فِرَارًا مِنْهُ     

    বুখারী ( হাদীস নং ৫৭৩৯) ও মুসলিম শরীফে (হাদীস নং ২২১৯) বর্ণিত এ দুটি হাদীসে রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহামারীগ্রস্থ এলাকায় শুধু যেতে নিষেধ করেননি বরং সে এলাকা থেকে বের হতেও নিষেধ করেছেন। কেউ হয়তো এর দ্বারা কোন রোগ ছোঁয়াচে হওয়ার প্রমাণ পেশ করবেন এবং বর্তমানে করোনাভাইরাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য যত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে সবগুলোকে যৌক্তিক মনে করবেন। 

মূলত “ভালো-মন্দ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে” বিশ্বাসের এ জায়গাটি মেরামত করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন উক্তি করেছেন। যেন কেউ মৃত্যুর ভয়ে সেখান থেকে বের না হয় এবং প্রবেশ করে আক্রান্ত হয়ে কেউ যেন প্রবেশ করার কারণে আক্রান্ত হয়েছেন এমন মনে না করেন। হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ গুলোর দিকে সামান্য দৃষ্টি দিলেই বিষয়টি বুঝে আসবে। আর না হয় কেবল অসুস্থ ব্যক্তিকেই বের হতে নিষেধ করতেন।   

# ইসলামের দৃষ্টিতে ছোঁয়াচে রোগ 

ইসলামের দৃষ্টিতে ছোঁয়াচে  বা সংক্রমণ রোগ বলতে কোন রোগ নেই। রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন-

 عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَال : “َ لا عَدْوَى وَلا طِيَرَةَ وَيُعْجِبُنِي الْفَأْلُ قَالُوا وَمَا الْفَأْلُ قَالَ كَلِمَةٌ طَيِّبَةٌ

ইসলামে কোনো সংক্রমণ, অশুভ লক্ষণ নেই। তবে আমি ভালো লক্ষণ গ্রহণ করি। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন ভালো লক্ষণ কি? বললেন, ভালো কথা। (মুসলিম শরীফ- ২২২৪)

لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ وَفِرَّ مِنْ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الْأَسَدِ

রোগের সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই। পেঁচার ডাকে অশুভ কিছু নেই, সফর মাসেও অশুভ কিছু নেই। আর কুষ্ঠরোগী থেকে সেই রকম পলায়ন কর, যে রকম সিংহ থেকে পলায়ন কর। (বুখারী ৫৭০৭, মিশকাত ৪৫৭৭) 

এ হাদীসের শেষাংশের ব্যাখ্যায় ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, রোগীর কষ্ট বৃদ্ধি না করতে এবং দুর্বল ঈমানের অধিকারীরা শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে এ ধরনের রোগী থেকে দূরে থাকবে। রোগীর কাছে গেলে সংক্রমণ হবে এ ধরনের আকীদা-বিশ্বাসের মূলোৎপাটন পূর্বে উল্লেখিত হাদীস দ্বারাই হয়ে গেছে।

এছাড়া অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন… لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ  উপস্থিত কতিপয় সাহাবী আরজ করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা মরুভূমিতে কিছু উট দেখি যেগুলো পরিপূর্ণ সুস্থ অবস্থায় মরুভূমিতে চড়ে। কিন্তু হঠাৎ যখন তাতে খুজলিযুক্ত একটি উট প্রবেশ করে তখন অন্য উটগুলো খুজলিযুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহর রসূল তাদের জবাবে বললেন, তাহলে প্রথমটিকে কে সংক্রমিত করল? (বুখারী শরীফ- ৫৭১৭)    

 আল্লাহ তাআলা যাকে রোগ দিবেন সে রোগীর কাছে গেলেও আক্রান্ত হবে, না গেলেও আক্রান্ত হবে। তবে এর মানে এই নয় যে কোন জীবাণু গায়ে মেখে নিবে। কোন ধরনের জীবাণু ও নাপাকী থেকে বেঁচে থাকা ঈমানের সার্বক্ষণিক দাবি। 

لَا يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ “অসুস্থ উটের মালিক যেন সুস্থ উটের মালিকের উটের কাছে অসুস্থ উটগুলো নিয়ে না যায়” হাদিসের ব্যাখ্যাও অনুরূপ। যাতে মানুষের ঈমান-বিশ্বাস হেফাজতের সাথে সাথে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতাও রক্ষা পায়। 

কেউ কেউ শেষোক্ত দুটি হাদিস থেকে “আল্লাহর ইচ্ছায় সংক্রমিত হয়” এমন কথার প্রমান পেশ করে থাকেন। মূলত সংক্রমনের আকীদা বস্তুবাদীদের। তাই তারা বস্তুকে ঘিরেই সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করে।  আল্লাহর ইচ্ছায় সংক্রমিত হয় একথা বলার পরে আমরাও যদি বস্তুবাদীদের কর্মপন্থা গ্রহণ করি তখন বাহ্যিকভাবে দুটি বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য থাকেনা। তাই বাস্তবতার নিরিখে এ কথা বলতে চাই যে, রসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের উপর আমল করলে বস্তুবাদের ফিতনা থেকে আমাদের ঈমান হেফাজত হবে, ইনশাআল্লাহ! আর অগ্রিম সর্তকতা অবলম্বন  করার ক্ষেত্রে ঈমান ও বিশ্বাস ঠিক রেখে যেটুকু অবলম্বন করা যায়। 

 # করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে কী করতে হবে?

প্রথমত কেন এই ধরনের মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটে সে বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হবে। কুরআন এবং সুন্নাহ অধ্যায়ন করলে একথা স্পষ্ট বুঝে আসে যে, জমিনে গুনাহ ও নাফরমানীর কারণেই মাঝেমধ্যে এ ধরনের বিপদ এসে থাকে। তাই প্রথমেই আমাদের গুনাহ ছেড়ে তাওবা করতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে ধরনের গুনাহ হয় রাষ্ট্রকে সেই গুনাহগুলো পরিত্যাগ করতে হবে। রাষ্ট্র থেকে যিনা-ব্যভিচার সুদ ঘুষ দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করতে হবে। এগুলো না করে সতর্কতামূলক উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে তুলে দিলে তেমন কোন ফায়দা হবেনা।

ইসলামে সর্তকতা অবলম্বনের সুযোগ আছে তবে পশ্চিমারা যে বিশ্বাসে যেই ধরনের সর্তকতা অবলম্বন করে মুসলিমরা সে ধরনের সর্তকতা অবলম্বন করতে পারে না। আজকে করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি লাভের আশায় আমরা যেন পশ্চিমাদের পথ ধরে হাঁটছি। দেশের পতিতালয়গুলো বন্ধ করছি না, মদ জুয়ার আসর এখনো চলছে, সুদী অর্থনীতি নিয়মে পরিণত হয়েছে, ঘুষ বাণিজ্য চলছে সর্বত্র, সর্বোপরি উপেক্ষিত হচ্ছে কোরআনের বিধান। 

 পশ্চিমাদের পথে হাঁটার কারণে আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটি হচ্ছে সেটি হলো আমাদের মৌলিক বিশ্বাস তাকদীরের বিধান অবহেলিত হচ্ছে, মানুষ আল্লাহমুখী না হয়ে বস্তুমুখী হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় বস্তুর প্রভাবের কথা বললেও কর্মসূচি এমন গ্রহণ করছে যাতে শুধুমাত্র বস্তুর প্রভাবই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।  সুতরাং বিশ্বাসের সঙ্গে আমলও তেমন হওয়া চাই যাতে মৌলিক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হয়।   

# করোনাভাইরাসে মুমিনদের ভয় নেই

 করোনাভাইরাসের মতো বিপদ ছড়িয়ে পড়াতে মুমিনদের কোন ভয় নেই। কেননা রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- الطاعون شهاده لامتي (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৩৯৪৬) মহামারী আমার উম্মতের জন্য শাহাদত।

সুতারাং এ ধরনের কোন বিপদে যদি মুমিন আক্রান্ত হয়ে যায় এবং ধৈর্য ধারণ করে অতঃপর ইন্তেকাল করে আল্লাহ তাআলা তাকে শহীদের মর্যাদা দান করবেন। তাই অতি বিচলিত না হয়ে তওবা করি ও দোয়ার আমল চালু করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে বিষয়টি বুঝার তৌফিক দান করুন। আমীন!  

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here