খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী : সকাল থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। ঠান্ডা আবহাওয়া বিরাজ করছিল সারা জাপানে। জাপানের প্রসিদ্ধ দর্শনীয় স্থান মাউন্ট ফুজি নিয়ে নানা রহস্যময় কাহিনী শুনেছি বহুবার। এবার এত কাছে এসে না দেখে চলে যাব তা কোনভাবেই মানতে পারছিলাম না। তবে এই অল্প সময়ে বৈরি আবহাওয়ায় মাউন্ট ফুজি দেখা হবে কিনা তা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম।

সলাতুত তারাবীহ উপলক্ষে গত রমাযানে গিয়েছিলাম জাপানের সাগামিহারায়। হাফেজে কোরআন মাহে রমযানে কতটা ব্যাস্ত থাকেন তা সবারই জানা। সেই সঙ্গে আবার যদি ওয়াক্তিয়া নামাযের দায়িত্ব আসে তাতে তো ব্যস্ততার উপর ব্যস্ততা!

পাকিস্তানি প্রবাসী ইফতেখার ভাই তার ব্যবসার কাজে প্রায়ই ইয়ামানশি সিটিতে যায়। সেখান থেকে মাউন্ট ফুজি অনেকটাই স্পষ্ট দৃশ্যমান। আজও কোন এক কাজে তিনি সেখানে যাচ্ছেন। যোহর নামাযের পর আমাকে জিজ্ঞেস করে বসে, আমি তার সাথে যাবো কিনা। ভাবি, যেহেতু সুযোগ হয়েছে, না করা যাবে না। এমনিতেও আমার জন্য না করা সম্ভব ছিলনা। আমি তো এমন একটি সুযোগেই অপেক্ষায় ছিলাম। এক কথায় রাজী হয়ে যাই।

এখনো পথঘাট ভিজে আছে। বৃষ্টি উঠানামা করছে। মেঘ বৃষ্টির দিনে মাউন্ট ফুজি দেখা সম্ভব না। যেতে যেতে বৃষ্টি শেষ হয়ে যাবে ভেবে বের হই তার সাথে। সাগামিহারা থেকে ইয়ামানশি আমাদের গন্তব্যস্থল প্রায় ৮০ কি.মি. দূরত্ব। সব মিলিয়ে দুই ঘন্টার পথ। চলার পথে মাউন্ট ফুজি নিয়ে ইফতেখার ভাই থেকে নতুন কিছু জ্ঞান অর্জিত হয়।

জাপানের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট ফুজি। রাজধানী টোকিও থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিন-পশ্চিমে শিজুকা আর ইয়ামানশি প্রদেশের সীমান্তে হনশু দ্বীপে অবস্থিত এই পর্বতটি। এটি উচ্চতায় এত বিশাল যে রৌদ্রজ্জ্বল দিনে টোকিও আর ইয়োকোহামা থেকেও এটি দেখা যায়। কিছু গবেষকদের তথ্যমতে, মাউন্ট ফুজি বিশ্বের সবচেয়ে সৌন্দর্যময় পর্বতশৃঙ্গ, যার উচ্চতা ৩,৭৭৬ মিটার বা ১২,৩৮৯ ফিট।

মাউন্ট ফুজি বরফ দ্বারা বেষ্টিত একটি আগ্নেয়গিরি। মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এই অপরূপ সৃষ্ট পর্বত দেখে যে কেউ তাত্ত্বিক প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। নিরিহ এই পর্বত থেকে সর্বশেষ অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিলন ৩০০ বছর আগে। তারপর থেকে আজ অব্দি সৌন্দর্য বিলিয়ে যাচ্ছে অকাতরে। তবে ধারণা করা হয়, আবারও যে কোন সময় এই পর্বতশৃঙ্গ থেকে অগ্নুৎপাত হতে পারে।

ইফতেখার ভাইয়ের তথ্যে মনের মধ্যে একটা নতুন প্রশ্ন লালন করি। দুনিয়ার বুকে আমাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞান এটাই স্পষ্ট করে যে, আগুন আর পানি একটি অপরটির সম্পূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী। যার ফলে আগুনে পানি ছিটালে আগুন নিভে যায়। আবার পানিতে আগুন দিলেও পানি তা গ্রহন করে না।

ভাবনার বিষয় হচ্ছে, বরফের তাপমাত্রা সাধারন পানি থেকে মাইনাস ডিগ্রিতে থাকে। অনুরুপভাবে আগ্নেয়গিরিও সাধারণ আগুনের তাপমাত্রা থেকে প্লাস ডিগ্রিতে থাকে। অথচ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই ঘন আগ্নেয়গিরিকে বরফ দ্বারা বেষ্টন করে সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য পর্বত। সুবহানাল্লাহ।

প্রায় দীর্ঘ দুই ঘন্টা বাদে আমরা গন্তব্যে পৌঁছলাম। আমার দূর্ভাগ্য ছিল। মেঘলা আকাশ এতক্ষণে আর সাফ হয়নি। মাউন্ট ফুজি সামনে থেকে আর স্পষ্ট দেখতে পারি নি। যদিও পরবর্তীতে টোকিও হান্যাদা বিমান বন্দরের উঁচু ভবন থেকে স্পষ্ট দেখেছি। তবে কাছ দেখার আশাটা এখনো অপূর্ণই রয়ে গেল।

সর্বোপরি বলবো, পর্বতটি শিল্পীর চোখে ক্যানভাসের বিষয়ভাবনা বা পর্যটকদের কাছে প্রশ্নাতীত গন্তব্য হলেও মুসলমানদের ঈমান মজবুত করার এক অনন্য মাধ্যম বলা চলে।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here