মুফতী মোহাম্মদ এনামুল হাসান


আল্লামা মুফতী ফজলুল হক আমিনী (র.) শুধু বাংলাদেশের নয় বরং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতা, বিচক্ষণতা দেশব্যাপী ছিল সমাদৃত।

এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অন্যান্য রাজনীতিবিদদের মত গতানুগতিক নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য তিনি রাজনীতি করেননি বরং তাঁর রাজনীতি ছিল ইসলামী তাহজিব তামাদ্দুন ও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশের জনগণকে ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে আদর্শ রাষ্ট্র বিনির্মাণে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা।

তিনি একজন রাজনীতিবিদ হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন শীর্ষ একজন শায়খুল হাদিস, শীর্ষ মুফতী, কোরআনের হাফেজ, লেখক, গবেষক ও খটি আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ। তার গোটা জীবনই ছিল অন্যান্য যে কোন গুণীজনদের থেকেও উত্তম।

তিনি যখন হাদিস শরীফ পড়াতেন তখন হাদিসের মূল ব্যাখ্যা ও মর্মার্থ এমন ভাবে প্রকাশ করতেন যা বাংলাদেশে
অদ্বিতীয় একজন হাদিস ভাষ্যকার হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।
যাদের তার হাদিস-এর দরসে বসার সুযোগ হয়েছে তারা হাদিস আহরণের ক্ষেত্রে ধন্য হয়েছে।

মুফতী আমিনী (র) ছিলেন একজন শীর্ষ মুফতী। দেশের জনগণকে ইসলামী বিধি বিধান পালনে অভ্যস্ত করে
গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় ফতোয়া তিনি অবলীলায় বলে দিতেন। ফলে দেশের জনগণ প্রকৃত ইসলামী অনুশাসন
মোতাবেক জীবন পরিচালনা করে দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তির পথে হয়েছে উপকৃত। দেশ ও জাতীয়
প্রয়োজনে তিনি যুগোপযোগী ফতোয়া প্রদানের মাধ্যমে দেশের জনগণের কাছে একজন শীর্ষ মুফতী
হিসেবে সু-প্রসিদ্ধ হয়ে সকলের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছেন।

মুফতী আমিনী (র) ছিলেন আল-কুরআনের একজন হাফেজ।
তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে সুমধুর তেলাওয়াতে দেশের জনগণের হৃদয়কে করেছে আলোকিত। তাঁর কোরআন
তেলাওয়াত শুনে মানুষ কোরআন তেলাওয়াতে আকৃষ্ট হয়ে যেতো।
তাঁর মেধা ও প্রখরতা এত বেশি ছিল যে, কর্মজীবনেই তিনি মাত্র নয় মাসে পবিত্র কোরআনের হাফেজ
হয়ে যান যা এক অবিস্মরণীয়।

মুফতী আমিনী (র) ছিলেন একজন খাটি আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ।
দিনের বেলা রাজনৈতিক কর্মকান্ড সমাপ্ত করে রাতের আধারে যখন গোটা জাতি ঘুমে বিভোর, তখন মুফতী আমিনী (র) আপন প্রভুর দরবারে ইসলাম, দেশ ও জাতির জন্য শুধু কান্নাকাটিই করতেন না বরং কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ পর্যন্ত হয়ে যেতেন। বিশ্বাসই করা যায় না যে, দিনের বেলা যিনি ইসলাম ও দেশের দুশমনদের বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠে গর্জে উঠতেন, সেই তিনিই রাতের আধারে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় কান্নাকাটিতে বেহুশ হয়ে যেতেন।
মুফতী আমিনী (র) বলতেন কেহ যদি কিছু হাসিল করতে চায় সে যেন রাতের আধারে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে মঞ্জুর করিয়ে নেয়।

তিনি আরো বলতেন আল্লাহর দরবারে এমন ভাবে কান্নাকাটি করবে যেমন ভাবে একজন বাচ্চা তার মা-
বাবার নিকট কিছু চেয়ে কান্নাকাটি করে। মা-বাবা যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে সে প্রত্যাশিত জিনিস না দেয়
ততক্ষণ পর্যন্ত বাচ্চা যেমন কাঁদতে থাকে তেমনই আল্লাহর দরবারেও সেই ভাবে কাঁদতে হবে। তাঁর এ কথার বাস্তবতা তিনি নিজেই দেখিয়ে গেছেন যে কী ভাবে আল্লাহর দরবারে চাইতে হয়, কান্নাকাটি করতে হয়। তাঁর কান্নাকাটি দেখে দেশের আলেম ওলামাগণ, মাদ্রাসার ছাত্র ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণের অন্তরে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করার স্পৃহা জাগ্রত হতো।

মুফতী আমিনী (র) ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান ও সফল রাজনীতিবিদ। অতি অল্প সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক
ময়দানে নিজেকে একজন সফল ও গ্রহণযোগ্য রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।
বাংলাদেশে যখনই কোন ইসলাম বিদ্বেষী অপশক্তি দেশের জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তখন
সর্বপ্রথম মুফতী আমিনী (র) ই জাতির সামনে সেই অপশক্তির মুখোশ উন্মোচন করতে এগিয়ে এসেছেন।
ইসলামের বিরুদ্ধে যখনই কোন ষড়যন্ত্র হতো সে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সিংহের ন্যায় গর্জে উঠে ইসলাম
বিদ্বেষী কর্মকান্ড নিশ্চিহ্ন করে দিতেন তিনি। যার কারণে দেশের জনগণের নিকট মুফতী আমিনী (র) একজন
আপোষহীন নেতা হয়ে সকলের অন্তরে স্থান করে নিয়েছেন।

বিতর্কিত তাসলিমা নাসরিনকে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করণ, ২০০১ সালে হাইকোর্ট থেকে যখন সর্ব প্রকার ফতোয়া নিষিদ্ধ করা হয় তখন দুই বিচারপতিকে মুরতাদ ঘোষণা, নারী উন্নয়ন নীতিমালার নামে কোরআন বিরোধী আইন বাতিলের আন্দোলনসহ সকল ইসলামী আন্দোলনই তাঁর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার গোটা জীবন ছিল আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। সে সুবাদে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা ভোগ করতে হয়েছে।
কারাগারের অন্তরালে সীমাহীন নির্যাতন। সর্বশেষ গৃহবন্দি অবস্থায় থাকতে হয়েছে দীর্ঘ ২১মাস। গুম করা হয়েছিল তার ছেলে হাফেজ মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনীকে। কিন্তু তারপরও আন্দোলন সংগ্রামের পথ থেকে তাকে পিছু হটাতে পারেনি, দুর্বল করতে পারেনি তার সাহসকে।

মূল কথা হলো তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদদের জন্য আদর্শ। ২০০১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ নির্বাচনী এলাকা থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে হয়েছিলেন জাতীয় সংসদ সদস্য। বর্তমান রাজনীতিবিদরা এম.পি হতে পারলেই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পরে। জনগণের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে গড়ে তুলে অর্থের পাহাড়। বিগত সেনা সমর্থিত
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেশের দুই শীর্ষ নেত্রীসহ উল্লেখযোগ্য রাজনীতিবিদ কোন না কোন দুর্নীতির অভিযোগে কারারুদ্ধ হতে হয়েছে। কিন্তু একমাত্র মুফতী আমিনী (র)কে দুর্নীতির সাথে জড়ানোর সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।
এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কোন দল বা নেতা ভয়ে যেখানে মিছিল সমাবেশ করার চেষ্টাও করেনি মুফতী আমিনী (র) সেখানেও মিছিল সমাবেশ করে নিজেকে আপোষহীন ভূমিকায় অবতীর্ণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মুফতী আমিনী (র) ছিলেন আম্বিয়ায়েকেরাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবেতাবেঈন ও আসলাফদের
পূর্ণাঙ্গ সুযোগ্য উত্তরসূরি। হযরত ইব্রাহিম (আ:) কে আল্লাহতাআলা তাঁর রাস্তায় নিজ ছেলে হযরত ইসমাঈল (আ:) কে কুরবানি করার মাধ্যমে যে পরীক্ষা করেছিলেন ঠিক তেমনই ভাবে মুফতী আমিনী (র) কেও তার ছেলে
মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনীকে গুম করে তাঁকে ইসলামী আন্দোলন থেকে বিরত রাখার চেষ্টার মাধ্যমে সে
পরীক্ষায় ফেলা হয়েছিল এবং অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে মুফতী আমিনী (র) তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, আমার কাছে
আমার পরিবার বা ছেলে বড় নয়। ইসলামই আমার কাছে সবচেয়ে বড়!
আমার গোটা পরিবারকে যদি শহীদ করা হয় তাহলেও আমি ইসলামী আন্দোলন থেকে পিছপা হব না। বরং ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়েই যাব। প্রয়োজনে নিজেও শহীদ হব।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) যখন ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ মক্কা নগরীতে চালিয়ে যেতে লাগলেন
তখন ইসলামের কর্মকান্ডকে বাধাগ্রস্ত করতে শিয়াবে আবিতালিবে প্রায় ৩ বৎসর যাবত মুহাম্মদ (স)কে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল আত্মীয় স্বজন থেকে।

ঠিক তেমনই বাংলাদেশে যখন রাজনীতির ময়দানে আলেম ওলামাগণ মুফতী আমিনী (র) এর নেতৃত্বে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছেন তখনই বর্তমান মহাজোট সরকারও মুফতী আমিনী (র) কে দীর্ঘ ২১ মাস গৃহবন্দি করে রেখে পরিবার ও জনগণ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। যার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, আত্মসাৎ সহ কোন প্রকার অনৈতিকতা মূলক একটি মামলাও হয়নি সেই মুফতী আমিনী (র) এর বিরুদ্ধে এক স্ব-ঘোষিত
নাস্তিকের দায়ের করা মিথ্যা মামলায় ২১মাস গৃহবন্দি থেকে মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে। কিন্তু দেশের মানুষ বিশ্বাস করে যে, মুফতী আমিনী (র) কে তিলে তিলে মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে।

মোট কথা, মুফতী আমিনী (র) এর গোটা জীবন ই ছিল পূর্বসূরিদের প্রতিচ্ছবি। সে আলোকে তাসাউফের
ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অন্যতম। তাঁর ইসলামী বয়ান ছিল হাজ্বী এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী, হযরত কাশেম নানুতবী, রশিদ আহমদ গাংগুহী, হোসাইন আহমদ মাদানী, আশরাফ আলী থানভী (র) সহ আকাবের আসলাফদের বয়ানের ই নির্যাস। তার তেজদীপ্ত বক্তৃতায় দেশের মুসলমানদের হৃদয়ে জাগ্রত হত জেহাদী প্রেরণা।

মুফতী আমিনী (র) ছিলেন একজন লেখক, গবেষক ও ইতিহাসবিদ। যা তার লেখা অসংখ্য কিতাব এর পাতায় পাতায় প্রস্ফুটিত হয়েছে।
মুফতী আমিনী (র) বাতেল অপশক্তির মুকাবেলায় আপোষহীন মর্দে মুজাহিদের ন্যায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
জাতি এখন তাকিয়ে আছে ওলামায়েকেরামদের দিকে যে, আর কোন মুফতী আমিনীর জন্ম হবে কিনা? আর কেহ
এমন হুংকার দিয়ে বেরিয়ে আসবে কিনা যে, কোরআনের জন্য প্রয়োজনে ফাঁসির মঞ্চে যেতে প্রস্তুত তবুও ইসলাম
বিদ্বেষী খোদাদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আমরণ সংগ্রাম চালিয়ে ই যাব। সকল আলেম উলামা ও সর্বস্তরের তৌহিদী
জনতা প্রতীক্ষায় রয়েছে আরেকজন মুফতী ফজলুল হক আমিনীর। আল্লাহ্‌ তাকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম নসীব করেন।

1 COMMENT

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here