আল আমীন আজাদ

মুফতী আমিনী রহ. এর সাথে পাঁচ বছর থাকার ভাগ্য হয়েছে। সময়টা খুব বেশি নয়। এ ধরনের সংস্কারক মনীষীদের সোহবতে আরো বেশি থাকা প্রয়োজন। আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ ছিল, আমরণ যেন তাঁর সাথে থাকতে পারি। শুকরিয়া, আল্লাহ সে ফরিয়াদ কবুল করেছেন। তবে ‘আমরণ’ আমার বেলায় না হয়ে তাঁর বেলায় হয়ে গেল। আমি আমার মরণ পর্যন্ত খেদমত করতে পারলাম না, তাঁর মরণ পর্যন্তই ক্ষ্যান্ত থাকতে হলো। আল্লাহ এ উচ্চাশা পূরণ করুন মরণহীন জান্নাতেও তাঁর সঙ্গী হওয়ার মাধ্যমে।
সংস্পর্শের সময় অল্প হলেও পুরোটা সময় জুড়ে অনুসন্ধিৎসুর মতো তাঁকে ফলো করেছি। দেখেছি। শিখেছি অনেক কিছু। দেখা ও শেখার টুকরো টুকরো অনেক ঘটনা এখনো মনে আছে। কিছু বিস্মৃতির দেয়ালে চাপা পড়ে গেছে।

আজকে তাঁর ডাকা ৪ঠা এপ্রিলের হরতাল নিয়ে কিছু বলি। এ হরতালের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর ইসতিকামাত (দৃঢ়তা) ও খোদাভীতির অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে।


মন্ত্রী পরিষদ সভায় নারীনীতির খসড়া অনুমোদনের খবর পেয়ে মুক্তাঙ্গন থেকে প্রতিবাদ মিছিল বের করেন তিনি। সেখান থেকে ৪ঠা এপ্রিল হরতালের ডাক দেন। সারাদেশে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শীর্ষ অনেক আলেম তাঁর সমালোচনা করেন। অন্যান্য আলেমদের সাথে পরামর্শ না করে কেন এই সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথম ধাক্কা। কিন্তু তিনি এই হরতালকে জরুরি বিষয়ের সাথে তুলনা করে তাদের সমালোচনা এড়িয়ে গেলেন।


হরতালের সময় যখন ঘনিয়ে আসছে। নানা মাধ্যমে সরকার এই হরতালকে বানচালের চেষ্টা করে। এরই অংশ হিসেবে দেশের খ্যাতনামা একজন আলেম তাঁকে ফোন করে বাসায় নিমন্ত্রণ করেন। বহু পীড়াপীড়ি করছিলেন সেই আলেম, আমিনী সাহেব রাজি হচ্ছিলেন না। শেষে বিচারপতি আ. রউফের মাধ্যমে ফোন করান। আমিনী সাহেব তাকে বেশ সম্মান করতেন বলেই হয়তো তাকে দিয়ে ফোন করানো। কী আর করা। বাধ্য হয়েই তাঁকে রাজি হতে হলো। নিমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে গেলেন সেই আলেমের বাসায়। আমরাও তার সাথে। সেখানে ওই আলেম এবং তার সমমনা আরো প্রসিদ্ধ কিছু রাজনীতিবীদকে পেলাম। আমি পাশের কক্ষে অবস্থান করছি। আমিনী সাহেবের সাথে তারা আলোচনা করছেন। নানান আলোচনার পর সর্বশেষ তাঁর এক উচ্চ কণ্ঠ শোনা গেল—‘সুতরাং হরতাল এক দিন আগেও হবে না পরেও হবে না; ৪ঠা এপ্রিলেই হবে।’ মজমা শেষ হলো। তিনি গাড়ীতে উঠলেন। তাঁর পাশের সিটেই আমি বসা। সহকর্মীদের আরো কয়েকজন গাড়ীতে ছিল। মজমাতে উচ্চ কণ্ঠে ওই কথাটা কেন বললেন তার উত্তর আমাদের দিচ্ছিলেন। বললেন, ‘তারা আমাকে হরতাল পেছানোর কথা বলে। বুজোস না! মানে হরতাল বানচাল করা আর কি। এই জন্য সাফ জানায়া দিলাম, হরতাল এক দিন আগেও না পরেও না ৪ঠা এপ্রিলই হবে। আর কথাটা জোরে বলছি কেন জানোস? যেনো দ্বিতীয়বার অনুরোধ না করে। নমনীয় স্বরে বললে তো বারবার অনুরোধ করবে। এই জন্য খুব জোর গলায় এটা বলে দিলাম।’ আল্লাহু আকবার! কী আশ্চর্য রকমের হেকমত! এভাবে তিনি আপন সিদ্ধান্তে অটল রইলেন।


হরতালের দিনক্ষণ আরো ঘনিয়ে আসছে। দু সপ্তাহ হয়তো বাকী। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের থেকে একের পর এক ফোন আসছে। বেশির ভাগ সেনা অফিসারদের থেকে। সব হুমকি মূলক। ফোনের বক্তব্য প্রায় এমন, ‘হরতাল প্রত্যাহার করুন। দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন না। এই বুড়ো বয়সে লাল ঘরে (জেলখানা) যেতে চান?’ একদিন এমন ফোন আসলো। অপর প্রান্ত থেকে এ ধরনের কথা বলা হলো। তিনি ফোনটা আমার হাতে রেখে একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘হরতালের সময় কাছায়া আসছে তো, এই জন্য ওরা এমন করতেছে।’ এ বিষয়ে তিনি ছিলেন নির্লিপ্ত। যেন কোন ভ্রুক্ষেপই করছেন না। এক আননোন (অপরিচিত) নাম্বার থেকে তো প্রতিদিন অগণিত ফোন আসতো। রিসিভ করলেই অপর প্রান্ত থেকে চুপ করে থাকতো। যন্ত্রণা দেয়ার উদ্দেশ্যেই তাদের এমনটি করা। একদিন তো তিনি ক্ষেপে গিয়ে কতোগুলো শুনিয়ে দিয়েছিলেন। খোদাভীতির কতোটা চূড়ায় তিনি পৌঁছেছিলেন! এ অবস্থাটা যে কত নাজুক তা ভুক্তভোগীরাই জানে। একই আমলে সমমনা কতোগুলো দল মিলে ২৪ এপ্রিল হরতালের ডাক দিয়েছিল। হরতালের দিন যতই ঘনিয়ে আসছিল, তাদের উপর হুমকি ধমকির পরিমাণ ততই প্রকট আকার ধারণ করেছিল। বহুল সংখ্যক পুলিশ তাদের নেতার অফিস ঘেরাও করা শুরু করলো। বাড়ি ঘেরাও করতে লাগলো। তাদের মুখপাত্র মাওলানা আ. লতিফ নেজামী এ ঘটনাগুলো আমিনী সাহেবের কাছে বলেছিলেন। তিনি বলেন, পুলিশ যখন তার অফিস, বাড়ি ঘেরাও করছিল, গোয়েন্দা বাহিনীর বিপুল পরিমাণ সদস্য যখন তার আশপাশে ঘুর ঘুর করছিল, বিভিন্ন রকমের হুমকি-ধমকি আসছিল তখন তাদের নেতা তটস্থ হয়ে পড়লেন। এক পর্যায়ে জনতার কাঙ্ক্ষিত সেই হরতাল স্থগিত ঘোষণা করলেন। কিন্তু আমিনী সাহেব। আল্লাহু আকবার! খোদাভীতির এক অনন্য উপমা স্থাপন করে বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না!


হরতালের দিন কয়েক আগে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন অফিসারদের একটি টিম আমিনী সাহেবের কাছে আসলেন। তাঁর সাথে আলাপচারিতা হলো। তাদের দাবীও ওই একটাই। হরতাল প্রত্যাহার করেন। আমিনী সাহেব দু হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিয়ে যান। তবুও হরতাল প্রত্যাহার করা হবে না।’ তাঁর এ অসীম সাহস দেখে তারা হতাশ মনে ফিরে গেলেন।

এ ঘটনাগুলো থেকে বিশেষভাবে তাঁর দুটি বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। এক. খোদাভীতি। দুই. ইসতিকামাত বা অবিচলতা। এই দুটি গুণই যুগে যুগে দ্বীনের কাণ্ডারিদের সফলতা এনে দিয়েছে। তিনিও হৃদয়ে জায়গা দিয়েছিলেন কেবল আল্লাহকে। দোজাহানে কেবল আল্লাহকেই ভয় করেছেন। অন্য কাউকে সামান্যও পরোয়া করেননি। ফলে শত বাধার মাঝেও লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থেকেছেন। আল্লাহ তাঁর উত্তরসূরীদের এ আদর্শ ধারণ করার তাওফিক দিন এবং তাঁকে জান্নাতের আ’লা মাকাম দান করুন। আমীন!

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here