তাওহীদ আদনান


তখন শীতের মৌসুম৷ প্রচণ্ড শীত৷ হাড় হীম হয়ে যায় অবস্থা৷ শীতের এমন মারমুখী হামলা স্বাধারণত দেখা যায় না বাংলাদেশে৷ তবুও যখন নামে, মাত্রাতিরিক্ত কঠিন এক রূপ ধারণ করেই নামে৷ শীতের এই আগ্রাসী থাবা কখনো কখনো শিরোনামও হয়ে যায় পত্রিকার পাতায়৷ খবরের কাগজে ভেসে ওঠে, শীতের তীব্রতায় অমুক অঞ্চলে নিহত অমুক৷

আমরা তখন ঢালকানগর মাদরাসায় পড়ি৷ পরীক্ষার মৌসুম৷ সেমাহী পরীক্ষা কড়া নাড়ছে সকলের দ্বারে৷ প্রায় মাদরাসাতেই পরীক্ষার আমেজ৷ কোথাও হয়তো শুরু হয়েছে৷ কোথাও বা হবে৷ বাংলাদেশে স্বাধারণত একই সময়ে সবগুলো মাদরাসাতেই পরীক্ষা হয়ে থাকে৷ সে হিসেবে মোটামুটি সবখানেই চলছিলো পরীক্ষার আনাগোনা৷

ঢালকানগরে স্বাধারণত চার দেয়ালেই অাবদ্ধ থাকতাম সর্বদা৷ ক্লাসরুম আর ছাত্রাবাস ছিলো ভিন্ন ভিন্ন৷ ক্লাস রুম এক প্রান্তে আর ছাত্রাবাস আরেক প্রান্তে৷ আসা-যাওয়ার জন্য ভেতর দিয়ে একটি রাস্তা থাকলেও স্বাধারণত বাহির দিক থেকেই যেতাম আমরা৷ আসা-যাওয়ার পথে একটি দোকান পড়তো৷ ওখান থেকে মাঝে-সাঝে পত্র-পত্রিকায় নজর বুলিয়ে, দেশের হাল-চালও জেনে নিতাম তখন৷

২০১২ সনের কথা৷ তখন ডিসেম্বর মাস সবে শুরু৷ বেশ কয়েকদিন যাবৎ পত্রিকার পাতায় একটি নতুন বিষয় দেখতে লাগলাম৷ সামনে নাকি ম্যাজিক ডে৷ ১২/১২/১২৷ এটা নাকি একশ বছরে একবার হয়৷ দুনিয়ার গোলকধাঁধা তখন কম বুঝতাম৷ বয়সে ছিলাম ছোট৷ ক্লাসের অন্য একজন থেকে বুঝে নিলাম ম্যাজিক ডে-এর মর্ম৷ ভালই৷ অবাক হলাম৷ মানুষ কত কিছুই না, খুঁজে খুঁজে বের করে আজব এই দুনিয়ায়৷

ম্যাজিক ডে-এর অপেক্ষায় দিন গুজরান করতে লাগলাম৷ শুনতে লাগলাম দিনটিকে স্মরণীয় রাখতে নাকি কত জন কত কিছু করছে৷ কখনো হাসতাম মুখ চেপে৷ কখনো বলাবলি করতাম৷ দুনিয়ার রং তামাশায় সত্যিই অবাক হতাম৷ কী কী হয় এই রং তামাশার দুনিয়ায় শুধু অবাক নয়নে অবলোকন করে যেতাম৷

একদিন ভাবলাম আমরাও স্মরণীয় করে রাখি দিনটিকে৷ খারাপ কী? ভাবতাম আর হাসতাম৷ একজন বললো, মিয়া স্মরণীয় করে রাখবেন, সেই ব্যবস্থা তো মাদরাসা কতৃপক্ষ করে দিয়েছে৷ ম্যাজিক ডে-তে পরীক্ষা শুরু৷ অনেকভাবেই স্মরণ রাখতে পারেন৷ জীবনের সবচেয়ে ভালো অথবা খারাপ পরীক্ষা দিয়ে চিরদিনের জন্য স্মরণীয় করে রাখেন৷

এ সবই ছিলো পরস্পরে দুষ্টুমিমূলক কিছু কথা-বার্তা৷ সবশেষে সব কিছুরই উর্ধে ছিল পড়া-লেখা৷ ১২ তারিখ থেকে পরীক্ষা৷ অল্প কয়েকদিন বাকী। খেয়ার দেয়নি তখনো৷ খুব মেহনত করতে হবে৷ সবকও চলছে৷ ফাঁকে ফাঁকেই প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে৷ খেয়ার হবে পরীক্ষার ছয়-সাতদিন আগে৷ মূল প্রস্তুতি আগেই নিয়ে নিতে হবে৷

দেখতে দেখতে দিনগুলো ফুরিয়ে আমরা পরীক্ষার দ্বারপ্রান্তে৷ ১১ তারিখ সেদিন৷ রাত পোহালেই পরীক্ষা শুরু৷ গভীর রাত পর্যন্ত চলতে থাকলো অধ্যবসায়৷ শীতের তীব্রতা পড়া-লেখার সামনে যেনো কাবুপ্রায়৷ প্রচণ্ড শীত হওয়া সত্বেও গভীর রাত পর্যন্ত পড়েই তারপর বিছানায় এলাম৷ রাত ১২ টা পেরিয়ে গেছে৷ তখনো ঘুমোয়নি সবাই৷ বিক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা চলছে কামরাময়৷

পূর্ণ ঘুমের প্রস্তুতি নিলো সবাই৷ লাইট বন্ধ করে ডিম লাইট জ্বালানো হলো কেবল৷ হঠাৎ বাহিরে শুরু হলো বৃষ্টিপাত৷ অঝোর ধারায় বৃষ্টি৷ বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ বৃষ্টি৷ ভারী বর্ষণ ছিলো সেদিনের সেই বৃষ্টিতে৷ চলছে তো চলছেই আর থামার যেনো কোনো নাম-গন্ধও নেই৷ রাত ১২টার পর যেহেতু ১২ তারিখ আরম্ভ হয়ে গেছে, তাই অনেকে মজা করে বলতে লাগলো, ম্যাজিক ডে-এর ম্যাজিক শুরু হয়ে গেছে৷

ম্যাজিক ডে-কে কেন্দ্র করে বাহিরে জায়গায় জায়গায় চলছিলো আতশবাজি৷ পুরান ঢাকা বলে কথা৷ সে কি উদ্ভট শব্দ! সহ্যের বাহিরে ছিলো সে সব আওয়াজ৷ সকালে পরীক্ষা৷ ঘুমুতে হবে এখন৷ এমন সময়ে এসব আওয়াজ কার ভালো লাগে? হঠাৎ অমন বৃষ্টিপাত শুরু হওয়াতে একটা উপকার হলো৷ বৃষ্টির কল্যাণে সব আতশবাজি বন্ধ হয়ে গেলো৷ সেই সাথে আমরাও রেহাই পেলাম উদ্ভট সেই শব্দদূষণ থেকে৷

সারা রাত সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল৷ শেষ রাতে জাগ্রত হলাম৷ সকলের মুখে গুঞ্জন৷ এই তীব্র শীতে এমন কঠিন বৃষ্টি! কিভাবে কী? হিসেব মিলছে না৷ ফজর নামাজ পড়তে আমরা জড়ো হলাম মসজিদে৷ তখনো মুহতামিম সাহেব মাওলানা জাফর আহমাদ সাহেব আসেননি৷ সকলে হজুরের পথে চেয়ে রইলো৷ হঠাৎ হুজুর আসলেন৷ চেহারায় কিছুটা বিষণ্নতার ছাপ দেখা গেলো৷ সবাই অবাক, কী হয়েছে হুজুরের?

নামাজান্তে হুজুর উঠে দাঁড়ালেন৷ ভারাক্রান্ত হৃদয়৷ কাঁদো কাঁদো স্বর বের হতে লাগলো হুজুরের কণ্ঠ চিরে৷ সবাই একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করছে৷ কী হলো? হুজুর এতোটা ভারাক্রান্ত কেনো? কী ব্যাপার কে জানে? সবাই হতচকিত হয়ে অপলক নেত্রে তাকিয়ে রইলো হুজুরের দিকে৷ হুজুর কুরআনের আয়াত ও হাদীসের বাণীর সমন্বয়ে কথা শুরু করলেন৷

মৃত্যুর ব্যাপারে কিছু আয়াত ও হাদীস পেশ করলেন৷ হয়তো হুজুর নিজেকেই নিজে শান্ত্বনা দিতে চাচ্ছিলেন৷ একদম ভেঙ্গে পড়েছেন হুজুর৷ আমরা দিগ্বিদিত শূণ্য অবস্থায় তাকিয়ে রইলাম৷ থেমে থেমে চোখ মুছে নিচ্ছেন হুজুর৷ কোনো সমীকরণ মিলছে না৷ হঠাৎ কেনো এমন বয়ান করছেন হুজুর! কেনইবা এতোটা ভেঙ্গে পড়েছেন? কুল-কিনারা পেলাম না আমরা কোনো৷

মুহতামিম সাহেব করাচি হযরত মাওলানা হাকীম আখতার সাহেব রহ.-এর খলীফা৷ হুজুরের একান্ত প্রিয় মানুষ করাচি হযরত৷ করাচি হযরত রহ. তখনো জীবীত৷ বৃদ্ধ বয়সে উপনীত৷ বলতে গেলে জীবনের প্রায় শেষ লগ্নে অবস্থান করছেন তখন৷ আমরা ভাবলাম করাচি হযরত চলে গেলেন কিনা! কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করতে লাগলো আমাদের মাঝে৷ কিছুই বুঝতে পারলাম না আমরা৷

হুজুর বয়ান করে যাচ্ছেন৷ ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কিছুই বলছেন৷ মূল কথায় অনুপ্রবেশ করার দুঃসাহস যেনো নেই হুজুরের৷ যেনো এমন সংবাদটি বলার মতো হিম্মতই পাচ্ছেন না তিনি৷ ভগ্ন হৃদয়ে কিভাবেই বা শুনাবেন এমন সংবাদ? মনোবল যেনো হারিয়ে বসেছেন সব! এক পর্যায়ে সংবাদটি বলেই বসলেন৷ আমরা আতঙ্কিত হয়ে গেলাম৷ সঙ্গে সঙ্গে মৃদু আওয়াজে পড়ে নিলাম ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিউন৷

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here