মুফতি জাকারিয়া হারুন :

স্বাধীনতা। মহান আল্লাহর সেরা দান। পরাধীনতা হচ্ছে খাঁচায় বন্দি পাখির মতো। আর স্বাধীনতা মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়ানো পাখির মতো। বহু ত্যাগ-তিতীক্ষার বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি লাল-সবুজের ভূ-খন্ড-। এ ভূ-খন্ডের জন্য প্রাণ দিয়েছেন অগণন জনতা। তাদের মাঝে অন্যতম ছিলেন আলেমগণ। তারা শুধু নিজেরাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি বরং অন্যদের উৎসাহ দিয়ে নিয়ে গেছেন মুক্তি সংগ্রামে। এ দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় বুজুর্গ হাফেজ্জি হুজুর রহ. মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এটা হচ্ছে জালিমের বিরুদ্ধে মাজলুমের যুদ্ধ। পাকিস্তানিরা জালিম আর আমরা বাঙালিরা মজলুম।’

মুক্তিযুদ্ধকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আগা শাহীর সাক্ষাৎকার, যা মার্কিন টেলিভিশন এবিসির মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল। ওই সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক বব ক্লার্কের কথায় স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, আলেম সমাজ মুক্তিযুদ্ধে জনগণের পাশে ছিলেন এবং সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। সূত্র : এম আর আখতার মুকুল, আমি বিজয় দেখেছি, বিস্তারিত পৃষ্ঠা নং – ১৬৭।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অগ্রসৈনিক মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৪৩ দিন আত্মগোপনে নেতৃত্ব দেন। বহু সাধারণ মানুষ মওলানার প্রেরণায় ট্রেনিং ক্যাম্পে চলে যান। দেশকে শত্রুমুক্ত করে বিজয় নিশান উড়িয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন। মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের সংগ্রহে থাকা অসংখ্য মূল্যবান ধর্মীয়গ্রন্থ ও তাঁর বাড়ি হানাদার বাহিনী জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দেয়।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহ-সভাপতি মাওলানা মোস্তফা আজাদ মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সশস্ত্রযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তার বাবা ছিলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার মেজর। যুবক, ছাত্রদের নিয়ে পাকিস্তানিদের প্রতিহত করতে গ্রামের মাঠে ট্রেনিং দিয়েছেন তিনি। গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী থানাধীন ধলগ্রাম ইউনিয়নের সাধুহাটি গ্রামের মাঠে ট্রেনিং সেন্টার খুলেছিলেন মোস্তফা আজাদের বাবা। মুক্তিযুদ্ধে তার যুদ্ধের এলাকা ছিল মেজর অব. জলিলের নেতৃত্বাধীন ৯ নং সেক্টর।

পটিয়া মাদরাসার প্রবীণ ওস্তাদ ছিলেন আল্লামা দানেশ রহ.। পটিয়া মাদরাসায় পাক সেনাদের গোলা বর্ষণে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধে অংশ নেন মাওলানা আব্দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী, তার ভাই মাওলানা উবায়দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী, মাওলানা আব্দুর রহমান, মাওলানা মুস্তাফিজ (হাতিয়া), মাওলানা আব্দুস সোবহান (মুহাদ্দিস), মাওলানা আবু ইসহাক (রাঙ্গুনিয়া), মাওলানা ইমদাদুল হক আড়াইহাজারী, মাওলানা দলিলুর রহমান (চন্দ্রঘোনা), মাওলানা মতিউর রহমান (রানীরহাট), মাওলানা আব্দুল মতিন কাজী, মাওলানা আমজাদ হোসেন (নাগেশ্বর), মাওলানা কামরুামান (নরসিংদী), মাওলানা বজলুর রহমান, মাওলানা বশির উদ্দীন, মাওলানা মুখলিস (চান্দিনা)। এছাড়া, ২৬ মার্চ ভোরে হানাদারদের গুলিতে শহীদ হন ঢাকার হাতিরপুল মসজিদের ইমাম।

একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামে যোগ দেন হাতিয়ার সশস্ত্রযোদ্ধা মাও. মোস্তাফিজ, চট্টলার কমান্ডার মাও. সৈয়দ, দুঃসাহসী সেনানী ছাগলনাইয়ার মাও. মাকসুদ ভূঁইয়া প্রমুখ আলেম সরাসরি রণাঙ্গণে যুদ্ধ করেছেন। তাদের অনেক গৌরবান্বিত কথা মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র এবং তাদের নিজেদের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে অল্প কয়েকজন আলেম মুক্তিযোদ্ধার নাম উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছেন অনেক আলেম মুক্তিযোদ্ধা। তাদের অনেকের নামও আমরা জানি না, অনেকেই ইতোমধ্যে দুনিয়া বিদায়ও নিয়ে গেছেন।

১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার গঠিত হলে মওলানা উবায়দুল্লাহ্ বিন সাইদ জালালাবাদী, মাওলানা আব্দুল্লাহ্ বিন সাইদ জালালাবাদী, খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় পেরিয়ে চলে যান ভারতে, যোগাযোগ করেন স্বাধীন বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহেমদের সঙ্গে। তাঁরই নির্দেশনায় মওলানা জালালাবাদী ভ্রাতৃদ্বয় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’ কোরআন তেলাওয়াৎ-তাফিসর পরিচালনার মাধ্যমে ‘শব্দ সৈনিকে’র ভূমিকা পালন করেন।

একদল এন্ট্রি ইসলাম বুদ্ধিজীবী স্বাধীনতা-সংগ্রামকে আলেম সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টায় অহর্ণিশ ব্যস্ত। তবে সত্য কোনো দিন মুছে ফেলা যায় না। চেপে রাখা যায় না ইতিহাস। ইতিহাস তার সমহিমায় ভেসে উঠবেই। আলেমগণ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জোরালো অবদান রেখেছেন, রাখছেন ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও রাখবেন।

এ দেশের সাধারণ জনগণের মতো আলেমগণও ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের একনিষ্ঠ যোদ্ধা। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা-সাধনা করেছেন স্বাধীনতার জন্য। মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ফরিয়াদ করছি, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল যুদ্ধাদের জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া, গাজীপুর।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here