অনিচ্ছাকৃত ভুলে ১৭৬ আরোহীসহ ইউক্রেনের একটি যাত্রীবাহী বিমান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ভ‚পাতিত করার কথা তেহরান স্বীকার করার পর গত শনিবার রাজধানী তেহরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগের দাবিতে কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এদিকে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে উসকানিমূলক তৎপরতা চালানোর অভিযোগে তেহরানে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত রব ম্যাকএয়ারকে আটক করায় ইরানের তীব্র সমালোচনা করেছে যুক্তরাজ্য।

সোলাইমানি হত্যা এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত অব্যাহত। তার মধ্যেই এ বার ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে গ্রেফতার করে সে দেশের সরকারের বিরাগভাজন হল ইরান। শনিবার ভুলবশত ইউক্রেনীয় বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কথা মেনে নিয়েছে তেহরান। তার পর থেকে সেখানে একাধিক জায়গায় সরকার বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সেই বিক্ষোভে ইন্ধন জোগানোর অভিযোগে গত কাল ব্রিটিশ রাষ্ট্রদ‚ত রবার্ট নাইজেল পল ম্যাকএয়ার ওরফে রব ম্যাকএয়ারকে গ্রেফতার করা হয়। ঘণ্টা তিনেক পরই যদিও তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে এ নিয়ে জবাবদিহি করতে ফের তাকে ডেকে পাঠানো হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, ইরান সরকার ভুলবশত ইউক্রেনীয় বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র দাগার কথা স্বীকার করার পর থেকেই দেশের একাধিক জায়গায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমান ভেঙে পড়ায় যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের হয়ে শনিবার তেহরানে আমিরকবীর ইউনিভার্সিটির সামনে বিশাল জমায়েত হয়। তাতে শামিল হন রবও। সেখান থেকে বেরিয়ে ব্রিটিশ দূতাবাসে যাওয়ার পথে একটি সেলুনে ঢোকেন। সেখান থেকেই তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এ ভাবে কোনও রাষ্ট্রদূতকে গ্রেফতারের ঘটনা আন্তর্জাতিক ক‚টনীতিতে নজিরবিহীন। তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রতিবাদ জানিয়েছে ব্রিটেন। তাদের দাবি, রব ম্যাকেয়ারকে গ্রেফতার করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে ইরান। ব্রিটেনের পররাষ্ট্র সচিব ডমিনিক রাব একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলেন, ‘কোনওরকম কৈফিয়ত ছাড়াই আমাদের রাষ্ট্রদূতকে গ্রেফতার করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে তেহরান। এই মুহূর্তে সন্ধি ক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইরান সরকার। হয় রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একঘরে হওয়ার পথে এগোক তারা, নইলে ক‚টনৈতিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনে পদক্ষেপ নিক।’

ইউক্রেনীয় বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র দাগা নিয়ে শুরু থেকেই আমেরিকাকে দোষারোপ করে আসছে ইরান। আমেরিকার বাড়াবাড়ির জন্যই এত বড় ভুল হয়ে গিয়েছে বলে ইতিমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছেন সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ। তার পরেও দেশের ভেতরেই বিক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে ইরান সরকারকে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দেশের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলি খোমেনি এবং সরকারের শীর্ষ আমলাদের পদত্যাগের দাবি তুলছেন বিক্ষোভকারীরা। শনিবার আমিরকবীর ইউনিভার্সিটির সামনে বিক্ষোভের যে ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে, তাতেও খোমেনির পদত্যাগের দাবি তুলতে দেখা গিয়েছে বিক্ষোভকারীদের।

শুরুতে বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা অস্বীকার করে ইরান। তার জন্য সরকারকে ‘মিথ্যুক’ বলেও অভিযোগ করতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। অনেকে আবার সরকারের বিরুদ্ধে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগও এনেছেন। তাদের প্রশ্ন, এক দিকে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে যখন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছে, সেইসময় বিমানবন্দর থেকে ওই বিমানটিকে ওড়ার অনুমতিই বা দেওয়া হল কেন? যে বা যারা এই গাফিলতির জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবিও তুলেছেন অনেকে।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানে শরীফ ও আমির কবির নামে অন্তত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে জড়ো হয় শিক্ষার্থীরা। প্রথমে তারা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে জড়ো হয়। কিন্তু সন্ধ্যা নাগাদ তা বিক্ষোভে রূপ নেয়। আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি এই উত্তেজনায় পরিস্থিতির একটি প্রতিবেদন করতে গিয়ে কিছু বিরল তথ্য দিয়েছে। সংস্থাটি জানায় যে, এক হাজারের বেশি মানুষ দেশটির নেতাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে এবং সোলাইমানির ছবি ছিঁড়েছে।

শিক্ষার্থীরা বিমানটি ভ‚পাতিত করার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের, এবং যারা এই ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিবাদী স্লোগানের মধ্যে ছিল ‘কমান্ডার-ইন-চিফ পদত্যাগ করুন’। এখানে তারা শীর্ষ নেতা আলি খামেনিকে উদ্দেশ্য করে স্লোগানটি দিয়েছে। এছাড়া ‘মিথ্যাবাদীদের মৃত্যুদন্ড দাও’ বলেও তারা স্লোগান দেয়। পরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ‘ছত্রভঙ্গ’ করে দেয়। বিশেষ করে যারা রাস্তা অবরোধ করে ছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায় যে, বিক্ষোভে টিয়ার গ্যাস ছোড়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরাও সরকারের এ পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এদিকে এক টুইট বার্তার মাধ্যমে এই ‘অনুপ্রেরণামূলক’ বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইউক্রেনের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভ‚পাতিত করার ঘটনার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের অ্যারোস্পেস কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আলি হাজিজাদেহ। তিনি জানান, ক্ষেপণাস্ত্র অপারেটর নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ইরানি বাহিনীর কাছে তথ্য ছিল, মার্কিন বাহিনী তাঁদের ঘাঁটিতে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের দিকে ‘ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র’ ছুড়েছে। ওই সময় ইউক্রেনের উড়োজাহাজটিকে ভুল করে ‘ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র’ ভেবে আঘাত হানেন ওই অপারেটর।

জেনারেল হাজিজাদেহ বলেন, ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অপারেটরের হাতে ১০ সেকেন্ড সময় ছিল। তিনি সেটিকে আঘাত করা বা না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। আর এই পরিস্থিতির মধ্যে তিনি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, সিদ্ধান্ত যাচাই করার জন্য অপারেটর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধ্য। কিন্তু ওই সময় যোগাযোগ ব্যবস্থায় কিছু বিপত্তি দেখা দেয়। তিনি জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল যাতে না হয় সে জন্য সামরিক বাহিনী এই ব্যবস্থার উন্নয়ন করবে।

উল্লেখ্য, ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পিএস-৭৫২ বুধবার কিয়েভ যাওয়ার উদ্দেশ্যে তেহরানের ইমাম খোমেনি বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পরই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। ইরাকের মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরে ওই বিমানটি ভ‚পাতিত করা হয়। গত ৩ জানুয়ারি বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানি কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় এ হামলা চালায় ইরান।

তবে ইরানের ভুলে চলতি সপ্তাহে ইউক্রেনীয় যাত্রীবাহী বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে স্বীকার করে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেছেন, এতে গভীর অনুশোচনা, ক্ষমা ও শোকপ্রকাশ করেছে তার দেশ। এক সংবাদবিজ্ঞপ্তিতে তারা দাবি করেছে, ফের যাতে এমন ভুল না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র বাহিনীর পর্যায়ে অভিযান প্রক্রিয়ায় মৌলিক সংস্কার আনা হবে। সূত্র : বিবিসি, আল-জাজিরা।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here